কলকাতায় আবাসিক হোটেলে আগুনে সাত বাংলাদেশীসহ ৯ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এটিকে নিছক একটি অগ্নিদুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনাস্থল এমন একটি ভবন- যেখানে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো এবং আবাসিক হোটেল পরিচালনায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো- নিহত সাত বাংলাদেশীর মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছে। এই মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা কারণে টানাপড়েন চলছে। অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সামান্য অস্পষ্টতাও বাংলাদেশের নাগরিকদের মনে সন্দেহ আরো গভীর করবে। ফলে তদন্ত শুধু দ্রুত নয়; স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক আস্থার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
কলকাতার অগ্নিকাণ্ডের ভেতর দিয়ে আমাদের সামনে একটি রূঢ় বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশীদের জন্য ভারত শুধু পর্যটন বা ব্যবসার গন্তব্য নয়; দীর্ঘদিন ধরে দেশটি বাংলাদেশের রোগীদের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাগন্তব্য। গণমাধ্যমের খবর- প্রায় প্রতি বছর ২৫ লাখ বাংলাদেশী চিকিৎসা নিতে ভারতে যান। তারা খরচ করেন প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা এখন আর ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতিরও অংশ হওয়া উচিত।
কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে হতাহত বাংলাদেশীদের পাশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনের সক্রিয় উপস্থিতি জরুরি। লাশ দেশে আনা, আহতদের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দেয়া, পরিচয় শনাক্তকরণ- এসব তাৎক্ষণিক দায়িত্বের পাশাপাশি মৃতদের পরিবার যেন যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়, সে বিষয়েও কূটনৈতিক ও আইনি তৎপরতা প্রয়োজন। আরেকটি বিষয় ভাবতে হবে- ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাংলাদেশী রোগী ও তাদের স্বজনদের নিরাপদ আবাসনের বিষয়ে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা দরকার। মানুষ কেন চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যাচ্ছে, রাষ্ট্রকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ নজর যে প্রয়োজন, তা ফুটে উঠছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ এবং বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার পরও আমরা কেন চিকিৎসাব্যবস্থা সেই অনুপাতে উন্নত করতে পারছি না? বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি, রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা, নার্সিং ও জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে মূল্যায়ন থাকা দরকার। ঘাটতি থাকলে রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে। আর সরকারি হাসপাতালে সেবার মান, জবাবদিহি এবং রোগীর আস্থাও বাড়াতে হবে। শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়, মানসম্পন্ন চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত উন্নয়ন অত্যাবশ্যক।
এখন কর্তব্য হলো- কলকাতায় মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত বাংলাদেশীদের পরিবারগুলো নিয়ে সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের প্রতিকার আনতে হবে।