বছরজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন বাংলাদেশের সঙ্গী। কখনো বন্যা, কখনো খড়া। এসব নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকা। গত কয়েক দিনে বৃষ্টিতে দেশের নদ-নদীর পানি বেড়েছে। গণমাধ্যমের খবর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তত আটটি নদ-নদীর পানি বাড়ছে। আগামী কয়েক দিন এসব নদ-নদীর পানি আরো বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে করে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলায় দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। বাঁধ রক্ষায় দিনরাত প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়েছেন স্থানীয়রা। গত মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ৪৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন সাড়ে ৯ হাজারের বেশি মানুষ। প্রশাসন ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। এতে আশ্রয় নিয়েছেন ১১৫ জন। কানাইঘাট উপজেলা বাজারের ব্যবসায়ী আজহার উদ্দিন বলেন, ‘ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে যখন বেচাকেনার সময়; তখন দোকানে পানি উঠে মালপত্রের ক্ষতি হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির জন্য ক্রেতাও নেই।’ অন্য দিকে উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রামের তিস্তাসহ কয়েকটি নদ-নদীর পানিতে জমি তলিয়ে যাওয়ায় বাদামসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত বিনষ্ট হয়েছে। এতে চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার কৃষকদের প্রায় চার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
দখল আর দূষণে বাংলাদেশের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। যেটুকু টিকে আছে তাতে নাব্যতা সঙ্কট প্রকট। বৃষ্টি হলে পানি ধারণ করতে পারে না। একই দশা দেশের সব জলাশয়গুলোর। ফলে বৃষ্টি হলে নদ-নদীর পানি উপচে পড়ে। প্লাবিত হয় লোকালয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন মানুষজন।
অন্য দিকে উজানের দেশ ভারতে বৃষ্টিপাত বেশি হলে ওই পানি আমাদের দেশে বন্যার তীব্রতা বাড়ায়। বাংলাদেশে বন্যার নেপথ্যে ভারতের পানি অন্যতম প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে ভারত যেমন আমাদের দেশে বন্যা সৃষ্টি করে; ঠিক তেমনি শুষ্ক মৌসুমে পানি না দিয়ে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে মারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সৃষ্ট বন্যা যেন ভারতের মর্জি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের এমন অবস্থানের অবসানে ‘পানি কূটনীতি’ জোরদার করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের দারস্থ হতে হবে। ভারত-বাংলাদেশ পানি সমস্যার সমাধান দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এর আজো সুরাহা হয়নি। অন্য অনেক বিষয়ের মতো পানি নিয়েও ভারতের আগ্রাসন দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না।
প্রশ্ন হলো- আমরা কি বারবার এসব মানবসৃষ্ট বন্যার কবলে পড়ব? আমাদের কী কিছুই করার নেই? একথাও ঠিক যে, দেশের যেসব নদ-নদী, খাল-বিল বেদখল হয়ে গেছে, সেগুলো দখলমুক্ত করতে হবে। সেই সাথে সব ধরনের জলাধারের নাব্যতা বাড়াতে দরকার পরিকল্পিত খনন কর্মসূচি। এসব শুধু পরিকল্পনা করলে হবে না, যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে এ মুহূর্তে অতি জরুরি কুড়িগ্রামের মতো বন্যাকবলিত জনপদে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। দেশের সব মানুষ যখন ঈদ আনন্দ উপভোগ করবেন; তখন বন্যাকবলিত মানুষজন সহায়তার অভাবে তা থেকে বঞ্চিত হবেন- এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।