হাসিনার দানবীয় শাসনে মানবাধিকার যেনতেনভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। তার পুরো শাসনকালজুড়ে বর্ধিতহারে গুম হন অসংখ্য নাগরিক। গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতিকার পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। উপরন্তু তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতন-নিপীড়ন এবং ভয়াবহ বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশে গুম পরিস্থিতি নিয়ে অব্যাহত উদ্বেগ প্রকাশ করে গেছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের অধীনে পরিচালিত ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলেন্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (ডব্লিউজিইআইডি) গুমের ঘটনাগুলো তদন্তে আসতে চাইলে বাধা দেয়া হয়। হাসিনার শাসনের পুরো এক দশকের বেশি সময় তাদেরকে বাংলাদেশ সফরের অনুমতি দেয়া হয়নি। অবশেষে গত রোববার ডব্লিউজিইআইডির দুই সদস্য চার দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন।

বাংলাদেশে গুমের ইস্যুটি এখনো স্পর্শকাতর বিষয়। হাসিনার পলায়নের পর তার গোপন বন্দিশালা আয়নাঘর থেকে কিছু মানুষ মুক্তি পায়। তিন শতাধিক মানুষের এখনো কোনো হদিস নেই। গুমের শিকার অনেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। তারা জঘন্য নির্যাতনের বিভীষিকা বয়ে চলেছেন। অনেকে এখনও ভীত সন্ত্রস্ত। কারণ গুম চক্রের সদস্যরা বহালতবিয়তে আছেন। গুমের তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন করেছে। কমিশন ইতোমধ্যে সরকারের কাছে দুই দফা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কমিশনের কাছে গুমের এক হাজার ৮৫০টি অভিযোগ পড়েছে। তবে এর সাথে জড়িতদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা কাজে গতি নেই। বরং প্রধান অভিযুক্তদের কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।

ডব্লিউজিইআইডি জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও তাদের অধিকার সুরক্ষার জন্য কাজ করে। তারা গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তা করে এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি যে গুরুতর সেটি হাসিনার শাসনকালেই তারা টের পেয়েছিল। গুমের অভিযোগ নিয়ে ডব্লিউজিইআইডি ২০১৩ সালে প্রথম বাংলাদেশ সফরে আসতে চায়। সরকার তাদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। এরপর ক্রমাগত সংস্থাটি সরকারের কাছে আবেদন করে বাংলাদেশ সফরে ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৪ এপ্রিল অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা হাল ছেড়ে দেয়। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাদের জন্য সুযোগ মিলল। তবে এর আগেই ড. ইউনূস সরকার জাতিসঙ্ঘের গুমবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে সই করে। এখন থেকে বাংলাদেশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ- রাষ্ট্র নাগরিকদের গুম করবে না।

বাংলাদেশে নিষ্ঠুর শাসনের অবসান হওয়ার ১০ মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। এর মধ্যে দেশে একটি গুমের ঘটনাও ঘটেনি। অর্থাৎ, সরকার সচেতনভাবে এই অপরাধ থেকে বিরত থেকেছে। মনে রাখতে হবে, গুম সাময়িকভাবে বন্ধ হলেই তা আর কখনো গুম-সংস্কৃতি চালু না হওয়ার নিশ্চয়তা নয়। এ অবস্থায় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে গুম চক্রকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা। যত দিন দোষীদের বিচারের আওতায় আনা না যাবে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের হুমকি থেকেই যাবে। কারণ যারা এই গুরুতর অপরাধ করেছে তারা প্রশাসনের ভেতরই আছে।

সরকারের উচিত গুমের প্রতিকারের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে সক্রিয় ডব্লিউজিইআইডিকে তাদের কাজে সব রকম সহায়তা দেয়া।