ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসন জাতির ঘারে চেপে বসেছিল জগদ্দল পাথরের মতো। দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয় এক ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা। ছিল না কোনো নাগরিক অধিকার এবং মানবাধিকার। স্বৈরাচারের মতের বিরুদ্ধে গেলেই তার ওপর নেমে আসত নির্যাতনের খড়গ। গুম-খুনের মতো নিষ্ঠুর উপায়ে দমন করা হতো ভিন্নমত। অবশেষে বিপুল রক্তের বিনিময়ে গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। ছাত্র-জনতার অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন পরিচিতি পেয়েছে চব্বিশের বিপ্লব হিসেবে। অনেকে বলছেন, দ্বিতীয় স্বাধীনতা।

শেখ হাসিনার আমলে পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কোনো ভোট হয়নি। নির্বাচনের নামে হয়েছে তামাশা। স্বৈরাচারের বিদায়ে এখন দেশে নাগরিকবান্ধব পরিবেশ ফিরে এসেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে। জন-আকাক্সক্ষা প্রাধান্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে চায়। এর মধ্যে আগামী সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল সরব হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে এমন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে। ন্যূনতম সংস্কার করে নির্বাচনের পথরেখা ঘোষণার কথা বলছেন তারা। অন্য দিকে ইসলামপন্থী দলগুলো এবং হাসিনা পতনে সম্মুখসারিতে থাকা ছাত্রদের গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি চায় রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর নির্বাচনের আয়োজন করা হোক। তা না হলে এবারের গণ-অভ্যুত্থানও ব্যর্থ হবে। যে পরিণতি হয়েছিল নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের।

ফ্যাসিবাদ-উত্তর দেশে নির্বাচনের সময় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই মতভেদের সুযোগে স্বৈরাচারের দোসররা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে, এমন শঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা এই বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলারও পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের অবস্থানে ফারাক স্পষ্ট।

নির্বাচন ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাথে গত বুধবার বৈঠক শেষে হতাশা প্রকাশ করেছে বিএনপির প্রতিনিধিদল। বিএনপির প্রতিনিধিদলকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার এবং সংস্কার দৃশ্যমান করে নির্বাচন দিতে চায় সরকার। সরকারের তরফ থেকে এ-ও বলা হয়েছে, এ বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। বৈঠকে বিএনপি বলেছে, ডিসেম্বরেই নির্বাচন করা সম্ভব। এর পরে গেলে নির্বাচন নিয়ে জটিলতা বাড়বে। এ দিকে ঢাকায় সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, আগামী রমজানের আগে নির্বাচন চায় তার দল। অন্য দিকে মার্কিন উপ সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেছেন, মৌলিক সংস্কার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না এনসিপি।

দ্রুত নির্বাচনের কথা স্বীকার করে নিয়েও আমরা বলতে চাই, রাষ্ট্রযন্ত্রের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা না গেলে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানও জন-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারবে বলে মনে হয় না। তাই সংস্কার এবং নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সরকারের মধ্যে আরো আলোচনা হওয়া দরকার। আলোচনার মাধ্যমে ঘুচতে পারে দূরত্ব।