ফিলিস্তিনের গাজায় গত প্রায় দুই বছর ধরে পৈশাচিক বর্বরতায় মানুষ হত্যা করছে ইসরাইল। হত্যার ধারাবাহিকতা চলে আসছে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিন থেকে। অর্থাৎ গত প্রায় ৮০ বছর ধরে এই হত্যাযজ্ঞ চলছে। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদিবাদী ইসরাইল যে ধ্বংসযজ্ঞ, যে গণহত্যা চালাচ্ছে তা এককথায় বীভৎস ও বিভীষিকাময়। সব শেষে দেখা যাচ্ছে, গুলি করে, বিমান ও স্থলপথে সামরিক হামলার পাশাপাশি ক্ষুধাকে মারণাস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। অনাহারে মারা হচ্ছে লাখো মানুষ। মানবিক ত্রাণ পাঠানোর সব পথ বন্ধ করা হয়েছে। ত্রাণবাহী জাহাজ অপহরণ করা হয়েছে। একমুঠো খাবারের জন্য হাতপাতা কঙ্কালসার মানুষগুলোর ক্ষুধার জ্বালা চিরতরে মিটিয়ে দেয়া হচ্ছে গুলিতে।

অনাহারী শিশু মারা যাচ্ছে মায়ের চোখের সামনে, সেই চিকিৎসকের চোখের সামনে, যার কাছে নেই কোনো চিকিৎসার উপকরণ, নেই খাবার অথবা স্যালাইন, শিশুরা মরছে বিশ্ববাসীর চোখের সামনে যারা মানবতার কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে, আইন ও ন্যায়বিচারের কথা বলে। কিন্তু ফিলিস্তিনের মৃত্যুমুখী শিশুদের থেকে উল্টো দিকে চোখ ঘুরিয়ে রেখেছে।

আন্তর্জাতিক খবর, গাজায় অনাহারে মৃত্যুর ঝুঁকিতে এক লাখ শিশু। শুধু কি শিশুরা মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছে? নিশ্চয় না। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধসহ গাজার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ অনাহারে আছেন। দিনের পর দিন না খেয়ে শিশুরা আগে মারা যাচ্ছে, এরপর মরবে বৃদ্ধ ও দুর্বল শরীরের মানুষ, মরবে একে একে সবাই।

এর মধ্যে ইসরাইলের সামরিক হামলায় মৃত্যু লাখ ছাড়িয়েছে বলে বেসরকারি খবরে বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিবেকবান সুশীল সমাজের টনক নড়েনি। জাতিসঙ্ঘ হাত গুটিয়ে বসে আছে। এখন চলছে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ায় ইসরাইলের অন্যায় ও একতরফা শর্ত মেনে নিতে ফিলিস্তিনিদের তথা প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে বাধ্য করার চেষ্টা হিসেবে যে ক্ষুধার মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট।

মূলত ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা এখন যে পাশবিক আচরণ করছে, এমন দ্বিতীয় কোনো নজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই। কিন্তু যে যা-ই বলুন, আমাদের ধারণা, হামাস ব্যর্থ হয়নি, গাজাবাসীর মৃত্যু বৃথা যায়নি। কারণ নেতারা যা-ই করুন, বিশ্বের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণসমাজের সহানুভূতি ফিলিস্তিনিরা পাচ্ছেন। আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের অনেক দেশে তরুণরা সোচ্চার গাজাবাসীর পক্ষে। এসব তরুণ একদিন নেতৃত্বের আসনে বসে পরিস্থিতি পাল্টে দেবেন।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সে দেশের ২২১ এমপি। এটি আশাব্যঞ্জক। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে একঘরে হয়ে পড়ছে দেশটি। এসব ঘটনা অদূরভবিষ্যতে ইতিবাচক ফল দেবে বলে আশা করা যায়; কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষার সুযোগ গাজাবাসীর নেই। তাদের রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এখনই।

তুরস্ক, ইরান ও পাকিস্তানের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রয়াস জোরদার করলে কিছুটা হলেও সুফল পাওয়া সম্ভব বলে আমরা মনে করি।