জুলাই মাস চলছে। ২০২৪ সালের ওই সময়ের ভয়াবহ ও নৃশংস গণহত্যার ক্ষত এখনো দগদগে হয়ে আছে মানুষের মনে। এখনো অনেক আহত জুলাইযোদ্ধা হাসপাতালে আছেন। এই অবস্থায়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই খুনিদের সাফাই গেয়ে বয়ান তৈরি করার চেষ্টা করছেন অনেকে।

গতকাল নয়া দিগন্তে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এতে জানানো হয়েছে, ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে জুলাই খুনিদের পক্ষে যারা সাফাই বয়ান তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, সেটি ভাবছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ইউটিউব ও ফেসবুক পেজে গণহত্যাকারীদের পক্ষে চালানো প্রচার ও অনুষ্ঠানগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এসব সাফাই-বয়ান বিচারে প্রভাব ফেলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

খুনিদের পক্ষে বয়ান তৈরির এই ধৃষ্টতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব বয়ান তৈরি করে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিফ প্রসিকিউটর বলেছেন, যারা এতগুলো মানুষের শাহাদত নিয়ে টুঁ শব্দ করেননি, তারা এখন ইনিয়ে-বিনিয়ে গণহত্যাকারীদের পক্ষে কথা বলে ভিউ বাড়াতে চাচ্ছেন। এতে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

খুনিদের বাঁচাতে অথবা তাদের অপরাধ লঘু করে দেখানোর এই বুদ্ধিবৃত্তিক অপকৌশল রুখে দেয়া সময়ের দাবি। তবে আমরা মনে করি, এই প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনাল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। নিতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, তাদের বেলায় যেন আইনের শাসনের ব্যত্যয় না ঘটে। বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার যেন কোনোভাবেই লঙ্ঘন না হয়। আইনের কঠোর প্রয়োগ যেমন হওয়া উচিত, তেমনি তা যেন কোনোভাবেই ভিন্নমতের টুঁটি চেপে ধরার হাতিয়ার না হয়- ন্যায়বিচারের স্বার্থেই এটি জরুরি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে, অথবা আদালত-অবমাননা, মানহানি কিংবা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনার ক্ষেত্রে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার; এবং (খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলো।’

আইনবিদরা মনে করেন, এই স্বাধীনতা মানে পরম কোনো অধিকার নয়। চলমান কোনো গুরুতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা বা অপরাধীদের পক্ষে সাফাই গেয়ে জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পরিপন্থী অবস্থান নেয়া বাকস্বাধীনতা হতে পারে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারিতা নয়; কিন্তু সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি যেন কোনোভাবেই দুর্বল না হয়। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের মধ্যেই আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এটি যেন কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ বা রাজনৈতিক হয়রানিতে পরিণত না হয়। আমরা আশা করি, ট্রাইব্যুনাল মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া সমুন্নত রেখে এই অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে। কোনো অপশক্তি বা বিভ্রান্তিকর বয়ান যেন জুলাই গণহত্যার বিচার বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।