বাংলাদেশ এখন জ্বালানি বৈপরীত্যের মুখোমুখি। এক দিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, অন্য দিকে দেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র এবং বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রসীমায় নতুন গ্যাস আবিষ্কারের বিপুল সম্ভাবনা অনাবিষ্কৃত।
২০১২ ও ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের সামনে অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এক দশকের বেশি সময় পরও অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হয়নি। জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে কেন্দ্র করে কোনো অনুসন্ধান কৌশলও গড়ে ওঠেনি। ফলে জ্বালানি খাতের কার্যকারিতা নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
দেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও সার উৎপাদনের বড় অংশ দীর্ঘদিন দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল; কিন্তু চাহিদা দ্রুত বাড়লেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি বাড়েনি এবং পুরনো ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন কমেছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল সমুদ্রসীমা দেশের জ্বালানি সম্পদের অমিত সম্ভাবনার জায়গা। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও ভারতের মতো দেশগুলো সমুদ্রের তেল-গ্যাস কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছে। বাংলাদেশের জন্যও কার্যকর অফশোর অনুসন্ধান জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভাব্য প্রধান উপায়।
ভূতাত্ত্বিক ও ভূকম্পন জরিপে বঙ্গোপসাগরের একাধিক সম্ভাবনাময় ব্লøকের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অগভীর ও গভীর সমুদ্র উভয় অঞ্চলে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অগ্রগতি নেই। বহু ব্লক দীর্ঘদিন কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়নি এবং প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি।
সমুদ্রসীমা সম্প্রসারণের পর সম্ভাবনাময় গ্যাস ও তেলসম্পদ অনুসন্ধান নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি ধীর। অফশোর অনুসন্ধান ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হওয়ায় এখানে দক্ষতা, বিনিয়োগ ও ধারাবাহিক নীতিমালার অনুসরণ জরুরি। তবে প্রতিবেশী দেশগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অনুসন্ধান বা উত্তোলন বন্ধ করে দিচ্ছে, এমন আলোচনাও আছে, যদিও দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বা প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বরং মূল চ্যালেঞ্জ হলো ভূতাত্ত্বিক জটিলতা, পর্যাপ্ত আধুনিক জরিপের ঘাটতি, বিদেশী বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং সুপরিকল্পিত জ্বালানি নীতি গ্রহণই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাপেক্স জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সীমিত সম্পদ ও প্রযুক্তি নিয়েও এটি একাধিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। তবে ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক অফশোর অনুসন্ধানে সংস্থাটির এককভাবে সক্ষমতা অর্জন কঠিন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিদেশী প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সমন্বয়ই সবচেয়ে কার্যকর পথ। মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস, ব্রাজিলের পেট্রোব্রাস বা নরওয়ের মডেল এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। জ্বালানি সম্পদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সীমান্তবর্তী বা ট্রান্স-বাউন্ডারি গ্যাসক্ষেত্র। এসব সম্পদ রাজনৈতিক সীমারেখা মানে না, তাই বৈজ্ঞানিক জরিপ, তথ্য বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বঙ্গোপসাগর ও সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে সম্ভাব্য সম্পদ নিয়ে নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মতো কৌশলগত জ্বালানি খাতে পররাষ্ট্রনীতি, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং নৈতিকতার সমন্বিত ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সম্পদ শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে উত্তেজনা এড়িয়ে স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে যৌথ জরিপ, তথ্যবিনিময় এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা এগিয়ে নেয়া জরুরি। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সফল জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলেছে। ভারত স্থল ও সমুদ্র উভয় ক্ষেত্রে ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে কৃষ্ণা-গোদাবরি অববাহিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন করেছে। মিয়ানমার উপকূলীয় গ্যাস সম্পদ কাজে লাগিয়ে রফতানি আয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে। মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, কোনো দেশই শুধু বিদেশী কোম্পানির ওপর নির্ভর করেনি, আবার কেবল রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আটকে থাকেনি; বরং তারা কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এলএনজি আমদানি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা টেকসই সমাধান নয়। তাই স্থলে ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের সম্ভাবনা দ্রুত ও কার্যকরভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। পাশাপাশি বাপেক্সসহ জাতীয় অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানে প্রতিযোগিতা করার মতো শক্তিশালী করতে হবে।
জ্বালানি খাতকে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তের বাইরে এনে ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত জাতীয় কৌশলের আওতায় আনা জরুরি, কারণ একটি গ্যাসক্ষেত্র বা অফশোর প্রকল্প কয়েক দশক ধরে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; একইভাবে আমদানিনির্ভর ব্যবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সমুদ্রসীমার সম্ভাবনা আবিষ্কার দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
চীনের উন্নত ড্রিলিং প্রযুক্তি এবং মালয়েশিয়ার পেট্রোনাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন অভিজ্ঞতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের গ্যাস খাতে নতুন গতি আসতে পারে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট অথচ দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহ মাত্র দুই হাজার ৭০০ থেকে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতি কমাতে তিতাস, বাখরাবাদ, শ্রীকাইল ও মোবারকপুর গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ছয় হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাশাপাশি আধুনিক থ্রিডি সিসমিক জরিপ, গভীর অনুসন্ধান এবং অফশোর এলাকায় নতুন কূপ খননের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত গ্যাস সম্ভাবনা আরো স্পষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হবে।
তবে গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য মতে, চারটি কূপে চার ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে, এমন দাবি প্রমাণিত নয়। কূপ খনন, ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও উৎপাদন পরীক্ষার পরই প্রকৃত মজুদ জানা সম্ভব। যদি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়, তাহলে আগামী পাঁচ-দশ বছরে দৈনিক অতিরিক্ত ৫০০ থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যা এলএনজি আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি অর্থনীতি মূলত দেশীয় গ্যাস, আমদানিকৃত এলএনজি এবং পেট্রোলিয়াম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর বিপুল জ্বালানি আমদানি করতে প্রায় ১০-১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট সরাসরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। এ অবস্থায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হলে এলএনজি আমদানির প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হবে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। সার্বিকভাবে, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর নেতৃত্বই দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎকে টেকসই পথে এগিয়ে নিতে পারে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট