বাংলাদেশের বায়ুতে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (পিএম-২.৫) দূষণ ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। বায়ুদূষণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জনের মৃত্যু হচ্ছে, যা গড়ে প্রতিদিন ২৪২ জন। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতি দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। এমন উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, বায়ুদূষণ এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার বরাতে নয়া দিগন্তের একটি প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালÑ এই ছয়টি প্রধান শহরে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ছয়টি শহরে বায়ুদূষণজনিত মৃত্যু ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে বলে ওই গবেষণায় উঠে এসেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ঢাকায়, যেখানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় তিন হাজার ৮৪৮ জন অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি নগরাঞ্চলের বায়ুদূষণের দ্রুত অবনতির পাশাপাশি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত বহন করে।

আন্তর্জাতিক বায়ুমান সংস্থার তথ্য, বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় রাজধানী ঢাকার অবস্থান প্রায়ই শীর্ষে থাকে। ইটভাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নির্মাণকাজের ধুলাবালু, পুরনো ও কালো ধোঁয়ানির্গত যানবাহন, শিল্পকারখানার অনিয়ন্ত্রিত ধোঁয়া নির্গমন এবং বর্জ্য পোড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড বায়ুদূষণের প্রধান উৎস। এসব দূষণ শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

বায়ুদূষণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা জটিল অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। অসুস্থতায় কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বাড়ছে। উৎপাদনশীলতা কমছে। পরিণামে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর অর্থনৈতিক দিক থেকে জিডিপির ৫ শতাংশ ক্ষতি একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক, যা অবকাঠামো, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগের সমপরিমাণ সম্পদ নষ্ট করছে।

বায়ুদূষণ এখন যে পর্যায়ে, তাতে এটি মোকাবেলায় শুধু নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; জরুরি হয়ে পড়েছে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন। বায়ুদূষণ রোধে সর্বপ্রথম দরকার অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ করা। শিল্পকারখানার দূষিত ধোঁয়া নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা। নির্মাণ কাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ। গণপরিবহনের আধুনিকীকরণ, পুরনো যানবাহন অপসারণ এবং নগরজুড়ে সবুজায়ন বাড়ানো। এসব অবশ্য কর্তব্য কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সাথে বায়ুমানের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সঠিক তথ্য প্রকাশ এবং পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বায়ুদূষণ একটি নীরব ঘাতক। এটি সুস্থ মানুষকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে দেয়। এর প্রভাবে দেশের অর্থনীতিও দুর্বল হয়ে পড়ছে। জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন নীতি সাজাতে হবে, যাতে বায়ুদূষণকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। নাগরিকদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।

আমরা মনে করি, বায়ুদূষণের মতো গুরুতর জনস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা মোকাবেলা স্থানীয় সরকার, পরিবেশ অধিদফতর, শিল্পমালিক এবং নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়।