সাক্ষাৎকার : শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম এমপি
চোখের সামনে নিস্তেজ হয়ে গেল আমার ছোট্ট জাবির
Printed Edition
লাবিন রহমান
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া সবচেয়ে ছোট শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা এবং বর্তমান সংরতি নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বলেছেন, আমি শুধু একটি কথাই বলতে চাইÑ জুলাইয়ের শহীদদের যেন কেউ ভুলে না যায়। তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে পারছি। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের পরিবারের কষ্ট কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ায় এবং জুলাইয়ের আদর্শ বাস্তবায়ন করে, তাহলে আমরা অন্তত মনে করব আমাদের সন্তানদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক সাাৎকারে সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম এ কথা বলেন। এতে তিনি তুলে ধরেছেন তার সন্তানকে হারানোর বেদনাময় স্মৃতি, জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার কথা। তিনি জানান, মাত্র ছয় বছর বয়সী জাবির টেলিভিশনে আন্দোলনের খবর দেখে মিছিলে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠত। চাচার হেলমেট পরে বলত, ‘আমি আর্মি হয়ে পুলিশ মারব, দেখছো না পুলিশ আমার ভাইদের মারছে।’ ৫ আগস্ট পরিবারের সাথে উত্তরা এলাকায় বের হওয়ার পর হঠাৎ গুলিতে জাবির আহত হয়। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেয়ার আগেই তার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। রোকেয়া বেগম বলেন, পরিবারের সদস্যদের রক্তের গ্রুপ মিললেও সন্তানকে এক ব্যাগ রক্ত দেয়ার সুযোগও তারা পাননি।
বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি নিজেকে প্রায় এক হাজার ৪০০ শহীদ পরিবার ও ২০ হাজার আহত আন্দোলনকারীর প্রতিনিধি মনে করেন। সংসদে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয় তুলে ধরার পাশাপাশি জুলাই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের দাবি জানান। একই সাথে তিনি জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রায় রাষ্ট্রকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ন্যায়বিচার ও সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
নিচে তার সাাৎকারের বিস্তারিতÑ
প্রশ্ন : প্রথমেই আপনার ও আপনার পরিবারের বিষয়ে জানতে চাই।
রোকেয়া বেগম : আমি একজন সাধারণ গৃহিণী ছিলাম। এখন ১১ দলীয় জোটের সংরতি নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার স্বামী কবির হোসাইন একটি বেসরকারি মোবাইল রিটেইলার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আমাদের তিন সন্তান। বড় মেয়ে জুমাইনা কবির নেহা ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে প্রথম বর্ষে পড়ছে। মেঝো ছেলে জুহায়ের মাহতাব আবদুল্লাহ উত্তরার কে সি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। আর সবার ছোট ছিল জাবির ইব্রাহিম। ওর জন্ম ২০১৮ সালে উত্তরায়। ও-ই ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে আদরের সন্তান।
প্রশ্ন : জাবির কেমন শিশু ছিল?
রোকেয়া বেগম : জাবির খুবই প্রাণবন্ত, হাসিখুশি আর সবার প্রিয় ছিল। খাওয়াদাওয়ায় ওর খুব অনীহা ছিল। কিছুই খেতে চাইত না। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি ছিল ভীষণ আগ্রহ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম স্কুলে ভর্তি হয়। বিশেষ করে ইংরেজি আর গণিত ওর খুব প্রিয় ছিল। স্কুল থেকে ফিরে নতুন শেখা ইংরেজি শব্দ ও বাক্য আমাদের শুনাতো। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই শিক ও সহপাঠীদের কাছে ও খুব আদরের হয়ে উঠেছিল।
প্রশ্ন : জুলাই আন্দোলনের সময় এত ছোট একটি শিশু কিভাবে আন্দোলনের সাথে নিজেকে যুক্ত করেছিল?
রোকেয়া বেগম : আন্দোলনের প্রায় প্রতিদিনই আমাদের পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে ওর বড় বোন, মিছিলে অংশ নিত। বোনের বানানো ‘ডব ডধহঃ ঔঁংঃরপব’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে জাবির ঘরের ভেতর হাঁটত। প্রতিদিন বলত, ‘আমিও মিছিলে যাবো’। টেলিভিশনে আন্দোলনের খবর দেখত, মানুষের স্লোগান শুনত। ওর ছোট্ট মনেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ তৈরি হয়েছিল।
প্রশ্ন : ‘আর্মি হয়ে পুলিশ মারব’Ñ এই কথাটি কিভাবে বলেছিল?
রোকেয়া বেগম : ৫ আগস্টের আগের রাত থেকেই ওর একটাই কথাÑ ‘আমি মিছিলে যাবো।’ আমরা বুঝিয়ে থামানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাবাকে জড়িয়ে ধরে আবার একই কথা বলে। এরপর চাচার হেলমেট মাথায় দিয়ে ঘরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বলে, ‘আমি আর্মি হবো।’
ওর বাবা হাসতে হাসতে বললেন, ‘আর্মি কেন হবা?’ জাবির তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল, ‘আর্মি হয়ে পুলিশ মারব। দেখছো না পুলিশ কিভাবে আমার ভাইদের মারছে।’ এই কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে। এত ছোট্ট একটা শিশু টেলিভিশনে যা দেখেছে, সেটাই নিজের ভাষায় বলেছিল।
প্রশ্ন : ৫ আগস্টের সেই সকালটি কেমন ছিল?
রোকেয়া বেগম : সকালে আমরা সবাই একসাথে নাশতা করি। তখনও জানতাম লংমার্চ হবে। পরে জানতে পারি শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আমরা সবাই উত্তরার রাস্তায় বের হই। জাবির, ওর বাবা, চাচাÑ সবাই ছিল। সেদিন চার দিকে উৎসবের মতো পরিবেশ ছিল। মানুষ একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। কেক, মিষ্টি, বিস্কুট বিতরণ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল দীর্ঘ আন্দোলনের একটা বিজয় মানুষ উদযাপন করছে। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি কয়েক মিনিটের মধ্যেই এত বড় দুর্ঘটনা ঘটবে।
প্রশ্ন : এরপর কী ঘটেছিল?
রোকেয়া বেগম : তখন বেলা প্রায় ৩টার বেশি। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনলাম। প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো কেউ আনন্দে পটকা বা বাজি ফাটিয়েছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই দেখি জাবির ‘উহ’ বলে বসে পড়েছে।
পরে জানতে পারি এপিবিএনের দিক থেকে গুলি এসেছে।
আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি ওর উরু দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমার মাথা যেন কাজ করছিল না। ওর বাবা সাথে সাথে কোলে তুলে হাসপাতালে দৌড় দেন।
প্রশ্ন : হাসপাতালে নেয়ার পর কী হয়েছিল?
রোকেয়া বেগম : আমরা দ্রুত কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওর বাবার পুরো শরীর জাবিরের রক্তে ভিজে গিয়েছিল। আমি শুধু দেখছিলাম, আমার চোখের সামনে আমার ছোট্ট সন্তানটা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা হলো আমাদের পরিবারের অনেকেরই রক্তের গ্রুপ জাবিরের সাথে মিলেছিল। কিন্তু ও আমাদের সেই সময়টুকুও দেয়নি। আমরা এক ব্যাগ রক্তও দিতে পারিনি। একজন মা হিসেবে এই আপে আমি সারা জীবন বয়ে বেড়াব।
প্রশ্ন : জাবিরকে হারানোর পর আপনার পরিবারের জীবন কতটা বদলে গেছে?
রোকেয়া বেগম : আমাদের পুরো পরিবার বদলে গেছে। জাবিরের চাচা এখনো সেই হেলমেট আর মাথায় দেন না, যেটা পরে জাবির খেলত। প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে তিনি জাবিরের কবর জিয়ারত করে যান। বাড়ির প্রতিটি কোণেই জাবিরের স্মৃতি। ওর খেলনা, বই, পোশাকÑ সবকিছুই আমাদের চোখে জল এনে দেয়। একজন মা হিসেবে এই শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।
প্রশ্ন : এখন আপনি সংসদ সদস্য। এই দায়িত্বকে কিভাবে দেখছেন?
রোকেয়া বেগম : এটা আমার কাছে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, এটা শহীদ পরিবারগুলোর বিশ্বাসের জায়গা। আমি মনে করি, আমি প্রায় এক হাজার ৪০০ শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি। আমি ২০ হাজারের বেশি আহত মানুষ এবং জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া সব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে সংসদে গিয়েছি। সংসদে আমি জুলাইয়ে আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারগুলোর বিভিন্ন সমস্যার বিষয় তুলে ধরেছি। ভবিষ্যতেও এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে চাই।
প্রশ্ন : জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
রোকেয়া বেগম : আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাÑ বিচার যেন দ্রুত শেষ হয়। আমি আইনমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছি, বিচারপ্রক্রিয়া আরো দ্রুত এগিয়ে নেয়া হোক। তবে শুধু বিচার শেষ করলেই হবে না, রায়ও কার্যকর করতে হবে। শহীদ পরিবারের মানুষ হিসেবে আমরা ন্যায়বিচার দেখতে চাই।
প্রশ্ন : জুলাই সনদ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
রোকেয়া বেগম : আমি চাই জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ অরে অরে পালন করা হবে। আমি সেই কথার ওপর আস্থা রাখতে চাই। আমার বিশ্বাস, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এত মানুষ জীবন দিয়েছেন, সেই বাংলাদেশ গড়তে সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করবেন।
প্রশ্ন : শহীদ পরিবারের প থেকে দেশের মানুষের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
রোকেয়া বেগম : আমি শুধু একটি কথাই বলতে চাইÑ জুলাইয়ের শহীদদের যেন কেউ ভুলে না যায়। তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে পারছি। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের পরিবারের কষ্ট কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ায় এবং জুলাইয়ের আদর্শ বাস্তবায়ন করে, তাহলে আমরা অন্তত মনে করব আমাদের সন্তানদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।