বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক চিরকালীন। ফরাসি দার্শনিক জুলিয়েন বেন্দা তার কালজয়ী গ্রন্থ লা ত্রাইজোঁ দে ক্লের (‘বুদ্ধিজীবীর বিশ্বাসঘাতকতা’, ১৯২৭)-এ তীব্র ক্ষোভে লিখেছিলেন, যে মুহূর্তে চিন্তক সত্য ও ন্যায়ের নিরপেক্ষ সাধনা ছেড়ে ক্ষমতা ও গোষ্ঠীগত আবেগের সেবাদাসে পরিণত হন, সেই মুহূর্তেই ঘটে বুদ্ধিবৃত্তির মহা বিশ্বাসঘাতকতা। ইতালীয় দার্শনিক অ্যান্তোনিও গ্রামসি আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রকৃত বুদ্ধিজীবী কেবল পুঁথিগত পণ্ডিত নন তিনি অর্গানিক বুদ্ধিজীবী, যিনি জনমানুষের যন্ত্রণা ও আকাক্সক্ষার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এডওয়ার্ড সাইদের ভাষায়, বুদ্ধিজীবীর পরম দায়িত্ব হলো ‘ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য উচ্চারণ’ আর নোয়াম চমস্কি এক বাক্যেই সেই দায় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, ‘সত্যকে সমুন্নত রাখা এবং মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করা।’
এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটেই আজ বাংলাদেশের ‘জন আকাক্সক্ষা’ ও ‘জন বুদ্ধিজীবী’র সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। একটি জাতি যখন পুরনো কর্তৃত্ববাদের খোলস ভেঙে নতুন সমাজ-চুক্তির সন্ধানে নামে, তখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় এমন কিছু বাতিঘরের যারা দল-মতের সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতিকে দিশা দেখাতে পারেন। অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সেই বিরল বাতিঘরসম একজন। সতর্কবার্তাকে যিনি সারা জীবন প্রমাণ করেছেন উল্টো দিক থেকে; অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা নয়, নিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে।

আজ ১৭ জুলাই ২০২৬। সময়-নদীর প্রবল স্রোতে আমাদের মাঝ থেকে অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদের বিদায় নেয়ার ছয়টি বছর পূর্ণ হলো। এই ছয় বছরে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে এত গভীর ওলটপালট এবং গুণগত রূপান্তর ঘটে গেছে যে, ইতিহাসের এই নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে অবধারিতভাবেই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে আমাদের এই প্রিয় শিক্ষক ও অভিভাবককে। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে দেশ যে নতুন এক ‘জন-আকাক্সক্ষা’ বুকে ধারণ করে বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে ড. এমাজউদ্দীন আহমদের রাষ্ট্রচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন কেবল প্রাসঙ্গিকই নয়; বরং পথ হারানোর মুহূর্তে এক আলোকবর্তিকা। বেদনার বিষয়, তার আরাধ্য যে গণতন্ত্রের দুয়ার আজ খুলে গেছে, সেই বিজয় দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য তার হয়নি।
আমি তাকে প্রায়ই বলতাম ‘পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত একজন খাঁটি গণতান্ত্রিক মানুষ’। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বা ‘জন বুদ্ধিজীবী’। বুদ্ধিজীবী শব্দটিকে এ দেশে অনেকেই ক্ষমতার সমার্থক বানিয়ে ফেলেছেন। পদ-পদবি, বৈষয়িক লাভ আর পুরস্কারের মোহে অন্ধ হয়ে বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ যখনই সাধারণ মানুষের ভাষা ভুলে শাসকের তোষামোদে লিপ্ত হয়েছে, তখনই ড. এমাজউদ্দীন আহমদ হয়ে উঠেছেন এক ব্যতিক্রমী ও প্রদীপ্ত মিনার। তার জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রতি একনিষ্ঠতা সবার জানা ছিল; কিন্তু তিনি কখনোই নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকে কোনো সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে বন্ধক দেননি। দল ও গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে তিনি গণতন্ত্রকেই দেখেছেন জাতির জীবনপদ্ধতি হিসেবে। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তার সেই অবিচল অবস্থানের তীব্র অভাব আজ ২০২৬ সালের এই নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও সমাজের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় আমরা টের পাচ্ছি।
ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই কালজয়ী নীতিতে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন ‘লক্ষ মানুষের মাঝে একজন যদি ভিন্ন কথা বলে, তার কথা বলার স্বাধীনতার জন্য জীবনপাত করতেও প্রস্তুত থাকা উচিত।’ এই পরমসহিষ্ণুতা ও পরমতশ্রদ্ধাবোধই ছিল তার ব্যক্তিত্বের চাবিকাঠি। ১৯৫২ সালে মহান ভাষা-আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি কারাবরণ করেছিলেন; সেই তারুণ্য থেকে জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলন হোক কিংবা এক-এগারো-পরবর্তী সময় তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের পক্ষে অকুতোভয় এক কণ্ঠস্বর। বিগত দেড়-দুই দশকে আমরা ক্ষমতার দম্ভ, ভিন্নমতের ওপর নির্দয় দমন-পীড়ন এবং একপেশে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির যে করুণ রূপ দেখেছি, তা থেকে মুক্তির জন্য সমাজে ও রাষ্ট্রে যে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর প্রয়োজন ছিল, এমাজউদ্দীন আহমদ তার লেখনীর মাধ্যমে সেই বীজ বপন করে গেছেন বহু আগেই। আজ যখন দেশের তরুণ সমাজ ও আপামর জনতা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তখন তার এই বহুত্ববাদী ও সহনশীল দর্শনের চর্চা প্রয়োজন।
বর্তমান বাংলাদেশের জন-আকাক্সক্ষা মূলত কী? এ দেশের মানুষ আজ এমন একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চায় যেখানে জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে কোনো ছিনিমিনি খেলা হবে না, যেখানে ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণের অবসান ঘটবে, বিচার বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার কেবল সংবিধানের পাতায় নয়, বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। এই আকাক্সক্ষার প্রতিটি মোড় ও বাঁকে জড়িয়ে আছে অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের স্বপ্ন এবং তার আজীবনের রাষ্ট্রতাত্ত্বিক গবেষণা। বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক (Civil-Military Relations) নিয়ে তার আলোচিত গবেষণায় Military Rule and the Myth of Democracy কিংবা Bureaucratic Elites in Segmented Economic Growth-এর মতো গ্রন্থে তিনি বারবার এই সত্যটি তুলে ধরেছিলেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও কার্যকর গণতান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না। প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়লে যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে আজকের তরুণ প্রজন্ম তা হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করছে। গণমানুষের এই সমসাময়িক রাজনৈতিক চেতনা ও রাষ্ট্র-সংস্কারের আকাক্সক্ষার তাত্ত্বিক ভিত্তি ড. এমাজউদ্দীন বহু বছর আগেই স্পষ্ট করে লিখে গেছেন। তিনি রচনা করেছেন প্রায় ৩৯টি গ্রন্থ যার ৩০টি বাংলায়, ৯টি ইংরেজিতে এবং দেড় শতাধিক গবেষণা-প্রবন্ধ। এই বিপুল বৌদ্ধিক সম্পদই আজ আমাদের রাষ্ট্র-পুনর্গঠনের পাথেয়।
তিনি ছিলেন মূলত জাতীয় ঐকমত্যের এক অক্লান্ত কারিগর। বিগত দিনে এই ভূখণ্ডে আমরা দেখেছি, কিভাবে কৃত্রিম বিভাজনের রাজনীতি আমাদের জাতীয় শক্তিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। ড. এমাজউদ্দীন আহমদ তার জীবদ্দশায় সর্বদা এই চরমপন্থার বিরোধিতা করে এক সুস্থ মধ্যপন্থার রাজনীতি প্রচার করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বহুমাত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক ভিন্নতা থাকবেই; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক ভিত্তি ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য থাকা আবশ্যক। ভাষা-আন্দোলন ও যুক্তফ্রন্টের সেই উদ্দীপ্তকালে ফজলুল হক হলের নির্বাচিত ভিপি হিসেবে শেরেবাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী তিন ধারাকে এক মঞ্চে এনে জাতীয় ঐক্যের যে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা আজ কেবল উপাখ্যান নয়; বরং ২০২৬ সালের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে বিভক্ত ও ক্ষতবিক্ষত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক শিক্ষণীয় পাঠ। দল-মত-নির্বিশেষে সবার কাছে তার যে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তা আজকের এই মেরুকৃত সময়ে প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আপসহীন দেশপ্রেম ও নির্ভীক সত্য উচ্চারণের জন্যই জীবদ্দশায় এই বরেণ্য পণ্ডিতকে নানামুখী অন্যায়, নিপীড়ন ও অপমানের শিকার হতে হয়েছে। তার স্বকীয়তা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা হয়েছে; ক্ষমতার অন্ধ চশমাপরা শাসকরা তার বাড়িতে আক্রমণ করেছে, তার পরিবারকে লাঞ্ছিত ও অন্যায়-অনাচারের শিকার করেছে, তাকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার অপচেষ্টা চালিয়েছে; কিন্তু তিনি তার নৈতিক অবস্থান থেকে একচুলও নড়েননি। ক্ষমতার মোহ কিংবা ভয়ের কাছে মাথা নত না করার এই যে অদম্য চারিত্রিক দৃঢতা, তা আজ দুর্নীতি, সুবিধাবাদ ও ফ্যাসিবাদের অবশেষের বিরুদ্ধে লড়াইরত নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। মৃত্যুর পর মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার ঠাঁই হওয়া তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয় এ যেন এক জাতির পক্ষ থেকে তার আজীবন বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের নীরব স্বীকৃতি।
আমরা যদি সত্যিই একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই, তবে আমাদের চিন্তার জগৎ থেকে সঙ্কীর্ণতার দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। এই মুহূর্তে জাতীয় স্বার্থকে দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করার কোনো বিকল্প নেই। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ আজীবন যে ‘উদার গণতন্ত্র’ ও মানবিক মূল্যবোধের কথা বলে গেছেন, সেই স্বপ্নই আজ এ দেশের কোটি মানুষের প্রাণের দাবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। জুলাইয়ের রক্তস্নাত পথ পেরিয়ে জাতি যে অধিকার-সচেতন হয়ে উঠেছে, তার তাত্ত্বিক দিশারি হয়ে তিনি রয়ে গেছেন আমাদের চিন্তার অগ্রভাগে।
পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি আমাদের প্রিয় শিক্ষক ও অভিভাবককে। জনগণের এই নতুন জাগরণ ও জন-আকাক্সক্ষার প্রতিটি বাঁকে তার প্রদর্শিত চিন্তাধারা আমাদের সঠিক পথের দিশা দিক। ড. এমাজউদ্দীন আহমদের মতো নিবেদিতপ্রাণ ও ক্ষণজন্মা মনীষী অনির্বাণ প্রদীপ হয়ে বাতিঘরের মতো এই প্রিয় মাতৃভূমিকে পথ প্রদর্শন করবে আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের দৃঢ প্রত্যয়। হে প্রিয় শিক্ষক ও জনগণের বুদ্ধিজীবী, আপনার স্মৃতির প্রতি বিনম্র ও গভীর শ্রদ্ধা!
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়