মীর লুৎফুল কবীর সা’দী
ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন যাদের মূল্যায়ন তাদের অর্জিত পদমর্যাদায় সম্পূর্ণ হয় না; বরং তারা যে নৈতিক উত্তরাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি নির্মাণ করে যান, সেটিই তাদের প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে। ক্ষমতা তাদের পরিচয়ের উৎস নয়; চরিত্র, প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধই ইতিহাসে তাদের আসন নিশ্চিত করে। ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার ছিলেন সেই বিরল রাষ্ট্রনায়কদের একজন।

তার দীর্ঘ জনজীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তা কিংবা ক্ষমতার ব্যাপ্তিতে নয়; বরং সংবিধানের মর্যাদা, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের দৃঢ়তায় নিহিত। ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী; প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি, ধারাবাহিকতা ও সভ্যতার বাহক।

বিশ্বের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এমন অনেক নেতা রয়েছেন, যারা উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতা বা ক্ষমতার প্রদর্শনের জন্য নয়; বরং নীরব প্রজ্ঞা, সংযম, নৈতিক দৃঢ়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য যুগে যুগে স্মরণীয় হয়ে আছেন। জমিরউদ্দিন সরকার ছিলেন সেই ঐতিহ্যেরই একজন প্রতিনিধি।

তিনি একাধারে বিশিষ্ট আইনজীবী, সংসদ সদস্য, শিক্ষামন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার প্রকৃত পরিচয় এসব পদের সমষ্টির চেয়েও বড়। তিনি ছিলেন এমন একজন রাষ্ট্রচিন্তক, যিনি বিশ্বাস করতেন- সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, রাজনৈতিক মতাদর্শের রূপান্তর ঘটতে পারে; কিন্তু সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, সংসদ ও রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কখনো দলীয় স্বার্থের অধীন করা যায় না। রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের জন্য এগুলোর নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের ইতিহাস রাজনৈতিক সঙ্কট, সাংবিধানিক পরিবর্তন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সমৃদ্ধ। সেই দীর্ঘ অভিযাত্রায় বহু নেতা ইতিহাসের অংশ হয়েছেন; কিন্তু অল্প কয়েকজনই আছেন যাদের অবদান দলীয় রাজনীতির সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। জমিরউদ্দিন সরকার তাদের অন্যতম।

ক্ষমতা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীরভাবে নৈতিক। তিনি ক্ষমতাকে কখনো ব্যক্তিগত গৌরব বা রাজনৈতিক আধিপত্যের উপায় হিসেবে দেখেননি; বরং জনগণের অর্পিত একটি সাংবিধানিক আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ কারণেই তার কর্মজীবনে ব্যক্তিগত বিতর্কের চেয়ে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের দৃষ্টান্ত অধিক উজ্জ্বল হয়ে আছে।

তিনি ছিলেন সংযত ভাষার মানুষ। মতভেদের মধ্যেও সৌজন্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান ও ভদ্র আচরণকে তিনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অপরিহার্য শর্ত বলে মনে করতেন। আজকের বিভাজিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় দৃঢ়তা ও ভদ্রতা পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং প্রকৃত নেতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য দু’টি বৈশিষ্ট্য।

আমার ব্যক্তিজীবনের একটি বিশেষ সৌভাগ্যের কথা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক। তাকে আমি কেবল ইতিহাসের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখিনি; বরং তার স্নেহ, সৌজন্য ও অসাধারণ মানবিকতার প্রত্যক্ষ স্পর্শ পেয়ে ধন্য হয়েছি। তিনি ছিলেন আমার মরহুম শ্রদ্ধেয় বাবা অ্যাডভোকেট এ টি সা’দী রহ:-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী। তাদের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও নৈতিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমার বাবার ইন্তেকালের বহু বছর পরও তিনি সেই সম্পর্কের উষ্ণতা অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন।

তিনি যখন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি পত্র প্রেরণ করি। উত্তরে তিনি নিজ হাতে লেখা এক আন্তরিক চিঠিতে আমার প্রতি শুভেচ্ছা জানান এবং আমার বাবার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘তোমার মহিমান্বিত বাবা বেঁচে থাকলে আজ আমার অবস্থান দেখে কী যে খুশি হতেন। তার জন্য আমি আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করছি।’ এই কয়েকটি বাক্য আজও আমার কাছে এক অমূল্য ঐতিহাসিক স্মারক। এতে তার বিনয়, কৃতজ্ঞতা ও বন্ধুত্বের প্রতি আজীবন বিশ্বস্ততার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত আমার বিয়ের অনুষ্ঠানের স্মৃতিও আজ গভীরভাবে হৃদয়ে অম্লান। সে সময় তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আমার বাবার আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস ও তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ টি এম আফজাল।

আমার বাবা ১৯৮৯ সালে ইন্তেকাল করেন; কিন্তু তার অনুপস্থিতিতেও তার বন্ধুদের যে স্নেহ, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতা আমি অনুভব করেছি তা আমার জীবনের অন্যতম মূল্যবান প্রাপ্তি। তাদের জীবন আমাকে শিখিয়েছে মহৎ মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পদমর্যাদায় নয়; তার চরিত্রে, বিশ্বস্ততায় ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায়।

আজ যখন গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক সৌজন্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, তখন জমিরউদ্দিন সরকারের জীবন ও কর্ম আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন, যাদের কাছে রাজনীতি ছিল জনকল্যাণের, নেতৃত্ব ছিল নৈতিক দায়িত্ব এবং ক্ষমতা ছিল জনগণের অর্পিত আমানত।

জমিরউদ্দিন সরকার ছিলেন সেই বিরল রাষ্ট্রনায়কদের অন্যতম, যাদের জীবন ও কর্ম আমাদের শিক্ষা দেয়- রাষ্ট্রের মহত্ত্ব ব্যক্তিপূজায় নয়; বরং সংবিধানের প্রতি অবিচল আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি অটল অঙ্গীকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা ও নৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিক চর্চার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ