নিরীহ মানুষকে একের পর এক মামলায় জড়িয়ে নির্যাতন করা পুলিশ বাহিনীর পুরোনো অভ্যাস। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের উপায় এটি। পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তার গদি রক্ষায় পেটোয়া বাহিনী হিসেবে কাজ করার বিনিময়ে পুলিশকে সব রকমের অন্যায় অপকর্মের সুযোগ দেন। তার সাড়ে ১৫ বছরের ভয়াল দুঃশাসনে বেনজীরের মতো অসংখ্য পুলিশ কর্মকর্তা জনগণের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনে যান। তাদের অপকর্মের বিপুল ফিরিস্তি গত ৫ আগস্টের পর প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু সে সময় পুলিশের সামান্য দারোগাও যে কত বড় দানব হয়ে উঠেছিল সে খবর তেমন সামনে আসেনি।

গতকাল দৈনিক নয়া দিগন্তের এক রিপোর্টে এমনই এক ভয়াবহ ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। একজন নিরীহ তরুণ ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র আরিফ হাসান সুমনকে কোনো রকম কারণ ছাড়া একের পর এক স্পর্শকাতর মামলায় আসামি করা হয়। তাকে মুফতি হান্নানের একটি মামলায় ২০০৮ সালে সিআইডি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে গ্রেফতার দেখানো হয়। সে সময় প্রমাণিত হয়, এ সুমন পুলিশের তদন্তাধীনে থাকা মুফতি হান্নানের কথিত কোটালিপাড়ায় সাবানের ফ্যাক্টরির কর্মচারী হাসান নন। তার পরও সুমনকে ছেড়ে না দিয়ে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা ঘুষ চান এএসপি ফজলুল কবির। সে টাকা দেয়ার সামর্থ্য সুমনের পরিবারের ছিল না। কিন্তু টাকা না পেয়ে এমন কোনো স্পর্শকাতর মামলা নেই, যাতে আসামি করা হয়নি সুমনকে। ২০০৮ থেকে এখন পর্যন্ত গত ১৭ বছর ধরে আদালতের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে সুমনের পরিবার।

২০০৮ সালের ১২ এপ্রিল ঢাকার মালিবাগে অবস্থিত সিআইডি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে গ্রেফতার দেখানো হয় ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্র আরিফ হাসান সুমনকে। তার পর থেকে আজো ঘরে ফেরা হয়নি তার। তাকে ২০০০ সালের সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা মামলা, কোটালিপাড়ায় হেলিপ্যাডে বোমা পুঁতে রাখার মামলা, ২০০১ সালে গোপালগঞ্জে বানারীপাড়ায় গির্জায় বোমা হামলা মামলা, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিলের রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলাসহ ২০০৮ সালে মোহাম্মদপুর থানায় আরো দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় একের পর এক রিমান্ডে নিয়ে ফ্যানের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে, ইলেকট্রিক শক দিয়ে, নানা রকম অমানসিক নির্যাতন করা হয়। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী না দিলে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এভাবে একটি সম্ভাবনাময় মেধাবী তরুণের জীবন পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় পুলিশ নামের এক দানব।

সুমনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান জানান, শেখ হাসিনা সরকারের সময় যেনতেনভাবে তদন্ত করে বা তদন্তের নামে প্রহসন করে নিরীহ অনেককে ফাঁসিয়েছে পুলিশ। অভিযোগ আছে, এসব মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রত্যেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন।

আলোচিত সুমন এর মধ্যে একাধিক মামলায় বেকসুর খালাস পেয়েছেন। এখনো একাধিক মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। এ ধরনের মানবিক বিষয়ে আমাদের উচ্চ আদালতের স্বপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ আছে। সেটি যদি না-ও হয়, বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে এ বিষয়ে নির্দেশনা সুমনের পরিবার করতেই পারে। সেই সাথে সরকারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া; যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো এমন অপকর্মের সাহস কেউ না পান।