দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে হুমকির প্রসঙ্গ নানাভাবে সামনে আসছে। এ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো আলোচনায় উঠছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সেমিনারে খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঝুঁকি ও করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা এমন এক পরিস্থিতি যেখানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য খাদ্যের প্রাচুর্য থাকবে, সুলভ ও স্বাস্থ্যকর হবে। বাংলাদেশে এমন পরিবেশ ক্রমেই ভেঙে পড়ছে, যাকে বলা হচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তার হুমকি। জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার শিকার শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমে যাওয়া, জলবায়ুর বিরূপতা খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এর পাশাপাশি কৃষকের কাছে নকল ও নিম্নমানের বীজ সরবরাহও উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ। আছে নিরাপদ খাদ্যের অভাবও। নকল ও ভেজাল খাবার, জনগণের পুষ্টিজ্ঞানের অভাবও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার কারণ।
তবে এই ঝুঁকির অন্যতম বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এর ফলে কৃষি উৎপাদন কমছে, যা খাদ্যনিরাপত্তায় হুমকি তৈরি করছে। এর সাথে আছে জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়া, দুর্বল অবকাঠামো, উন্নত প্রযুক্তির অভাব ও ফসলের বৈচিত্র্যহীনতা।
বিআইডিএসের সেমিনারে কৃষি উৎপাদন ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপতা কৃষি খাতের বাইরেও আমাদের সার্বিক জীবনযাত্রার কিভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে সে বিষয়ও উঠে আসে। বলা হয়েছে- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শ্রমের উৎপাদনশীলতা কমছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শ্রমের উৎপাদনশীলতা কমছে ১১ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে কমছে কৃষিশ্রমিকের সরবরাহও। কৃষিশ্রমিকের আয় কমেছে ২০ শতাংশ। এসব কারণে ফসলের উৎপাদন কমে যায়, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ৩ থেকে ৫ শতাংশ।
একসময় দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল সর্বোচ্চ। সেটি কমে ২০২১-২২ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। তবে এখনো গ্রামীণ জীবিকার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃষি। শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশের কর্মসংস্থান এই খাতে। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো- কৃষির ওপর নির্ভর করেই দেশের ৭০ শতাংশ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে টিকে আছে। সুতরাং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সবার আগে কৃষির কথাই ভাবতে হবে।
তবে শুধুই কৃষিজ উৎপাদনই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের একমাত্র উপায় নয়। শিল্প খাতের বিকাশ অর্থনীতির মেরুদণ্ড গঠন করে। কিন্তু ১৫ বছরের নৈরাজ্যকর দুঃশাসনে অর্থনীতির সেই মেরুদণ্ডই আর সবল নেই। ব্যাংক খাত ধ্বংস করা হয়েছে, জ্বালানি খাত পঙ্গু করা হয়েছে, ফলে শিল্প খাতের বিকাশ রুদ্ধ হয়েছে। অর্থনীতি এতটাই নাজুক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, কৃষি খাতে উৎপাদন কমে গেলে আমদানির ওপর নির্ভর করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে জোর দেয়ার বিকল্প নেই। কৃষিজমি বাড়ানোর সুযোগ আমাদের সামান্যই। তাই ফসলের নিবিড়তা, বৈচিত্র্য আনা এবং খাদ্যের প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ ইত্যাদি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। এমন নীতি নিতে হবে, যা জলবায়ুঝুঁকি মোকাবেলা, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পুষ্টি উন্নয়নে উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেবে।