গত তিন দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। চরম জনভোগান্তি দেখা দেয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, নগরীর বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি জেলায় গতকাল বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের অফিসপাড়া-খ্যাত আগ্রাবাদ এলাকার সড়কে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ভেঙে অফিসে যেতে হয় মানুষকে। বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামায় ছেদ পড়ে। পতেঙ্গায় ধসে যায় নবনির্মিত সড়ক। রেললাইনে পানি জমে থাকায় হাজারো যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন আটকা পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

এ দিকে বর্ষণ ও জোয়ার-ভাটার প্রভাবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা এবং পার্বত্য একাধিক জেলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কর্ণফুলী উপজেলায় নিম্নাঞ্চলের সড়ক, বসতবাড়ি ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার ঘরবন্দী। জেলেরা নদীতে নামতে পারছেন না, ফলে তাদের আয়ও কমে গেছে। প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকায় আটকে পড়েন ৭৮ জন পর্যটক। তাদের উদ্ধার করা হয়েছে। বান্দরবানের সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। বান্দরবান শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সাতটি উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

এই পরিস্থিতি শুধু চট্টগ্রাম শহর বা পার্বত্য এলাকার নয়। সারা দেশেই বৃষ্টিপাতের কারণে নদ-নদীর পানি বেড়েছে। দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চার বিভাগে আগামী কয়েক দিনে স্বল্পমেয়াদি ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। এর ফলে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় নদী-সংলগ্ন নিচু এলাকা এবং নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

আকস্মিক বন্যা স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘস্থায়ী যাই হোক, মানুষের দুর্ভোগ নিশ্চিত। সতর্কীকরণের ফলে মানুষ নিজেদের পক্ষে যতটা সম্ভব প্রস্তুতি হয়তো নিতে পারে; কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের এবং সামাজিক মানুষের দায়িত্ব বেশি। জলাবদ্ধতা নিরসন, পানিবন্দী মানুষের নিরাপদ উদ্ধার, আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার সার্বিক প্রস্তুতি সরকারকে আগেভাগে নিয়ে রাখতে হবে। একই ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, সমাজসেবী সংস্থাগুলোকে, যাতে প্রয়োজনের সময় কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়।