জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক চলছে। অন্য দিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি কাম্য নয়। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে সংসদে বিতর্ক হয়েছে। গত রোববারের বৈঠকে সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা ছিল। কিন্তু কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেয়ার বিষয় নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বিতর্কের মাধ্যমে সুরাহা না হওয়ায় নতুন কমিটিও গঠন হয়নি।

বিতর্কের কারণ, বিরোধী দল জুলাই সনদ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দাবি করেছে। সরকারি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত। তবে এর সাথে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলকে যোগ দিতে হবে, এমন শর্ত দিয়েছে।

জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা আছে— সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দল পাবে। আর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে। এই বিধান সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাবে বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট একমত হয়েছিল। অর্থাৎ এটি ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে গত নির্বাচনের দিনেই গণভোট হয়েছে। জনগণ সেই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন সরকারি দল সেই সমঝোতা মানতে চাইছে না। তারা বলেছে, বিশেষ কমিটিতে নাম না দিলে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেয়া হবে না।

এর ফলে সরকারি দল শুধু যে রাজনৈতিক সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে বিষয়টি এতটুকুতে সীমিত থাকছে না; বরং জনগণের রায় উপেক্ষার মতো অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল। এই আচরণ প্রত্যাশিত নয়; কিন্তু এটিই বাস্তবতা। এতে জনমনে দলটি সম্পর্কে বিরূপ ধারণা জন্ম নেবে। কারণ জনগণই রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। তারই সুফল হিসেবে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। তাই এ দলের কাছে পূর্ণ গণতান্ত্রিক আচরণ ও রীতির অনুসরণ প্রত্যাশা করে জনগণ।

বিরোধী দল অবিবেচক হলে শুধু গণরায় উপেক্ষা করার ইস্যুতে সংসদ অচল করে দিতে পারত। গত ছয় মাসে তারা সেটি করেনি। যদিও অতীতের বিরোধী দলগুলো অনেক তুচ্ছ ইস্যুতে সংসদ স্থবির, এমনকি অচল করে দিয়েছে— এমন নজির অসংখ্য। বর্তমান সংসদে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে তা গুরুতর। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের মতো জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়, গ্যাস-বিদ্যুতে জনভোগান্তি, শিল্প ধ্বংস, অর্থনীতির মেরুদণ্ড ধসিয়ে দেয়া খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরানোর মতো অসংখ্য জ্বলন্ত জাতীয় ইস্যু আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এমন সংসদ মানুষ আশা করেনি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেয়ার জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করতেই হবে— এমন নয়। সরকার ইচ্ছা করলেই তা বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ এ বিষয়ে সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালীবিধির কোথাও নির্ধারণ করে দেয়া নেই।