অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম
প্রকৌশল ও প্রযুক্তিভিত্তিক যুগোপযোগী শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদন করত বিশ্বে একটি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-চুয়েট। এরই মধ্যে আমাদের চুয়েট এখন ২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রূপান্তরের আন্দোলনে ভূমিকা পালনকারী সর্বস্তরের সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
চুয়েট প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার অধিকতর প্রসার, গুণগত মান বৃদ্ধি এবং এক্ষেত্রে অগ্রসরমান বিশ্বের সাথে সঙ্গতি রক্ষা ও সমতা অর্জনের লক্ষ্যে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা, আধুনিক জ্ঞান চর্চা ও পঠন-পাঠনের সুযোগ সৃষ্টি ও সম্প্রসারণের সমন্বয়ে দক্ষ ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টেকসই উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
চট্টগ্রামে এক মনোরম প্রাকৃতিক পাহাড়ি ভূমিতে চুয়েট ক্যাম্পাস অবস্থিত। এই ক্যাম্পাসে সম্মিলন ঘটেছে পাহাড়, সমতল ও জলাধারের। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক সংলগ্ন এই ক্যাম্পাস। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে ১৯৬৮ সাল থেকে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করে। তখন কলেজটির শিক্ষাকার্যক্রম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির অধীনে পরিচালিত হতো। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ভার ন্যস্ত ছিল মন্ত্রণালয়ের হাতে এবং স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল গণপূর্ত অধিদফতরের অধীনে। কলেজটির সার্বিক পরিচালনা ত্রিপক্ষীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকায় যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে ও বিভিন্ন জটিল সমস্যার আবর্তে পড়ে মুখ্য উদ্দেশ্য অর্জন ব্যাহত হয়। ১৯৮৬ সালে দেশের চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্বায়ত্তশাসিত বিআইটিতে (Bangladesh Institute of Technology) রূপান্তর হয়। সীমিত পরিসরে স্বায়ত্তশাসন লাভের পরও বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিআইটি, চট্টগ্রাম নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি-সংক্রান্ত অসুবিধা, উন্নতমানের যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা গবেষণাকার্যক্রমের জন্য বাধা হয়ে পড়েছিল। অবশেষে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার উৎকর্ষতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিআইটি, চট্টগ্রাম ১ সেপ্টেম্বর ২০০৩ থেকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (Chittagong University of Engineering & Technology) চুয়েট নামে যাত্রা শুরু করে।
চুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে আমি বিগত ২৮ জুলাই, ২০২৬ সালে যোগদান করি। যোগদানের পর থেকেই সরকারের নীতি-নির্ধারক, প্রশাসন, চুয়েট পরিবার, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়েসহ সবস্তরের সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছি। পাশাপাশি সুদূর অস্ট্রেলিয়ার সিকিউ ইউনিভার্সিটি, নরওয়ের এগডার ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলরসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এসব আমার চুয়েটকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হয়ে থাকবে।
আমরা চুয়েটকে প্রথমে এশিয়ার সেরা মানে, এরপর বিশ্বমানের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে, দেশসেরা হিসেবে গড়তে চাই। এ হিসেবে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক Accreditation লাভের বিষয়টি জোরদার করা হয়েছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম চুয়েটে স্মার্ট ক্লাসরুম সিস্টেম চালু করার জন্য আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এরই মধ্যে একটি ফাউন্ডেশন থেকে উপহার হিসেবে ছয়টি বাস পাওয়া গেছে। আরো কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেমন— একটি আইসিইউ সংবলিত অ্যাম্বুলেন্স, একাধিক মিনিবাস, কার, মাইক্রো ক্রয় কিংবা অনুদান হিসেবে সংগ্রহের প্রচেষ্টা চলছে।
ছাত্রীদের আবাসন সঙ্কটের সমাধান হয়েছে। এখন ছাত্রদের জন্য নতুন একটি হল নির্মাণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ আবাসন সুবিধা গড়ে তোলার মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকলেও হল নির্মাণ না হওয়ায় ছাত্রদের আবাসনসুবিধা দেয়া যাচ্ছে না। দাফতরিক কাজের গতিশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নিয়োগ, আর্থিক, অবকাঠামোগত থেকে দাফতরিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
চুয়েটে বিশ্বমানের শিক্ষা-গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই। এজন্য দক্ষ শিক্ষক, গবেষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। চুয়েটকে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ভালো গন্তব্য হিসেবে গড়তে চাই। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন বৃদ্ধি করতে চাই। যেকোনো গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজকে এগিয়ে নিতে চাই। চুয়েটে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কোলাবোরেশন বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শিক্ষা-গবেষণায় বিনিময় বৃদ্ধি, বিদেশী শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ও অবস্থান নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি চুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশের ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ গড়ে তুলতে চাই।
চুয়েটের সর্বশেষ সমাবর্তন ২০১৯ সালে হয়েছিল। দীর্ঘ সাত বছর সমাবর্তন না হওয়ায় গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে হতাশা আছে। তাই গ্র্যাজুয়েটরা চান, নতুন বাংলাদেশে তাদের জন্য যত দ্রুত সম্ভব একটি সমাবর্তন হোক। চলতি বছরের শীত মৌসুমে ১৫ নভেম্বর-১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে চুয়েটের পঞ্চম সমাবর্তন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চুয়েট পরিবার চায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে দেশের প্রথম সমাবর্তন চট্টগ্রামে হোক।
চুয়েটের প্রধান ফটক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়, নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওই প্রধান ফটক সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে ব্যাংক, পোস্ট অফিস ও পুলিশ ফাঁড়িসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব সেবা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় জনগণের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।
তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। চুয়েটে বিশ্বমানের ল্যাব ইকুইপমেন্ট রয়েছে। সুদক্ষ শিক্ষক ও গবেষক রয়েছেন। চুয়েটের সক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে চুয়েট বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অনেক প্রকল্পে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছে। চুয়েটের এই সক্ষমতা এতদঞ্চল তথা দেশের বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। দেশের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম। এই অঞ্চলে অনেক শিল্প ও বাণিজ্যিক কারখানা রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দরও রয়েছে। তাই এখানে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ সেন্টার গড়ে তুলতে পারে চুয়েট।
চুয়েটের ১৭১ একর ভূমিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পরিবারের সদস্যদের মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার লোকের বসবাস। তবে এখানে পানিসঙ্কট তীব্র হচ্ছে। পুরনো আমলে স্থাপিত নিজস্ব পানি সরবরাহ ব্যবস্থা দিয়ে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাছাড়া ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও দিন দিন নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। তাই একটি টেকসই সমাধান জরুরি। চুয়েটের নিকটবর্তী পোমরাস্থ পানি শোধনাগার থেকে পানির আলাদা সংযোগ আনা যায়। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম ওয়াসা সংশ্লিষ্টরা চুয়েটের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাজ শুরু করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্যোক্ত সৃষ্টি, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল তৈরি, সফটওয়্যার তৈরি— প্রভৃৃতি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০২৩ সালে চুয়েট আইটি বিজনেস ইনকিউবেটরের যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে চুয়েটের নিজস্ব ভূমিতে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এটি নির্মিত হয়। এতে রয়েছে ১০তলা বিশিষ্ট ইনকিউবেশন ভবন ও ছয়তলা বিশিষ্ট মাল্টিপারপাস ভবন। নতুন ব্যবসার জন্য নির্ধারিত এবং প্রযুক্তিগতভাবে সজ্জিত ডেডিকেটেড ওয়ার্কস্টেশন। আইডিয়া আদান-প্রদানের জন্য কোলাবোরেটিভ জোন ও ব্রেইনস্টর্মিং জোন। উদ্যোক্তা ও গবেষকদের থাকার জন্য নারী ও পুরুষদের আলাদা দু’টি ডরমিটরি, যাতে ৮০টি কক্ষ রয়েছে। এটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অবস্থিত প্রথম ইনকিউবেটর। এটি এখনো হাই-টেক পার্কের অধীনে চুয়েটকে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি, ফাংশনালও হয়নি। যদিও এই আইকনিক প্রকল্পটি বড় অবদান রাখতে সক্ষম। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ যাতে এটি দ্রুত সময়ের মধ্যে চুয়েটকে হস্তান্তর করে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে একটি ফিজিক্যাল ও একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ করেছে চুয়েটের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিস। এটি যত দ্রুত সম্ভব অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। চুয়েটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার সহজ এবং সাশ্রয়ী হতে পারে। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডেও অবদান রাখতে পারে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Solar) বিষয়ে গবেষণায় অবদান রাখা যায়। চুয়েটকে দেশের প্রথম নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
চট্টগ্রাম শহর থেকে চুয়েট পরিবারের প্রায় পাঁচ হাজার জন নিয়মিত যাতায়াত করছে। ২৫ কিলোমিটার দূরের এই গমনাগমনে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া এতদঞ্চলে দেশের প্রধান পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কর্ণফুলী পেপার মিল, বিভিন্ন বাহিনীর ঘাঁটি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ অনেক বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃষি ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনাও এলাকাটি ঘিরে। কিন্তু রেল সংযোগ নেই। এরই মধ্যে কয়েক বছর আগে চুয়েটের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে রেল সংযোগ প্রদানের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন ছিল। তবে কাজটি এখন এক প্রকার থেমে আছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চুয়েট পর্যন্ত শাটল ট্রেন চালু করা যায়।
লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-চুয়েট