বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশকে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল। গত দেড় দশক জঙ্গলের শাসন প্রত্যক্ষ করেছে মানুষ। ন্যায়বিচার উধাও হয়ে যাওয়ায় অপরাধীরা ছিল সর্বেসর্বা। খোদ রাষ্ট্র গুম, খুন ও নাগরিক অধিকার হরণে হয়ে ওঠে বেপরোয়া। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশে এ অবস্থা কায়েম করেন। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিও তার শিকারে পরিণত হন। ২০১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে তাদের নৃশংস হত্যার পর এর বিচারেও বাধা দেয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে যে তা করা হয়; তার প্রমাণ এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন হাসিনা আমলে শতাধিকবার পেছানো। তখন দেশে আরো শত শত হত্যা ঘটেছে; তারও বিচার পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার।

দীর্ঘসূত্রতায় হত্যায় জড়িত ব্যক্তি ও এর পেছনের ষড়যন্ত্রকারীরা সূত্রহীন হয়ে যায়। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উদ্যোগ নিয়েও সাগর-রুনি হত্যা তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে এই সন্দেহ আগেই বদ্ধমূল হয় যে, এই সাংবাদিক দম্পতির হত্যা সংঘটন ও বিচারে বাধা দেয়ার পেছনে বড় কোনো কারণ আছে। সম্প্রতি গুমসংক্রান্ত অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এর সাথে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের সূত্র পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশন টিমের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য পাওয়ার কথা খবরে এসেছে। গুম খুনের কারিগর জিয়াউল আহসান ও কথিত সাংস্কৃতিককর্মী রোকেয়া প্রাচীর সাথে এর প্রাথমিক সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে সাগর-রুনি তখন একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করছিলেন বলেও প্রথম জানা গেল।

জিয়াউলের সহকারী জিজ্ঞাসাবাদে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত টিমকে জানিয়েছেন সাংবাদিক দম্পতি হত্যার আগে পরে রোকেয়া প্রাচীর সাথে জিয়াউল যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান করেন। দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি বিডিআর হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে জিয়াউলের অপকীর্তি ইতোমধ্যে প্রকাশ হয়েছে। তিনি বহু নিরপরাধ বিডিআর সদস্যকে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছেন। তাদের লাশও গুম করে দেন। অন্য দিকে রোকেয়া প্রাচী যে একজন হাসিনাপ্রেমী তার প্রমাণও আছে। জুলাই বিপ্লবে তিনি আন্দোলন দমাতে প্রচারণা চালিয়েছেন। প্রতিবাদী জনতার আবেগ নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। বিপ্লবীদের খাটো ও হেয়জ্ঞান করার হেন কোনো অপচেষ্টা বাদ রাখেননি। তার আগেও ২০১৮ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনেও তিনি হাসিনার নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের পক্ষে কাজ করেছেন। এরা যে দেশের বিরুদ্ধে সবসময় সক্রিয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের বিচারের বিষয় নয়। এটি আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার উপাদানও হয়ে উঠেছে। দু’জন কুখ্যাত ব্যক্তির এর সাথে সম্পৃক্ততা মামলার তদন্তে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি। এখন প্রয়োজন এর সূত্র ধরে হত্যায় অংশগ্রহণকারী ও হোতাদের শনাক্ত করা।

এই পর্যন্ত বিচারের তদন্ত ১২৯ বার পেছানো হয়েছে। এবার অন্তত একটি কার্যকর তদন্ত প্রতিবেদন সম্পন্ন করা যাবে বলে আশা করা যায়। এর সাথে সাথে দ্রুততম সময়ে বিচারকাজ সম্পাদন করতে হবে। যারা দোষী তাদের সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।