দেশে সম্প্রচার নীতিমালার অভাব নেই। কিন্তু নীতির ন্যূনতম প্রয়োগও নিশ্চিত করা হয় না। বিশেষ করে বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেল প্রদর্শনে আদৌ কোনো নীতি আছে বলে মনে হয় না। যার যেমন ইচ্ছা দেশী-বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেল দেখাচ্ছে। এমনকি অবৈধভাবেও দেখানো হচ্ছে অনেক বিদেশী চ্যানেল ও দেশীয় আইপি টেলিভিশন। এসব চ্যানেলের অনুষ্ঠানের মান বা বিষয়বস্তুর ওপর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। নিম্নমানের রুচিহীন অনেক অনুষ্ঠান যেমন বিনা বাধায় প্রচার হচ্ছে, তেমনই এমন বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠানও প্রচার হচ্ছে যেগুলো দেশের রাজনীতি, মূল্যবোধ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জনরুচির সাথে সাংঘর্ষিক এবং অনেকসময় সম্পূর্ণ বিপরীত। স্বাভাবিকভাবেই সমাজে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিপুল পরিমাণ রাজস্বও হারাচ্ছে সরকার।

সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, তথ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে ২৩২টি টিভি চ্যানেলের। এর মধ্যে ফ্রি চ্যানেল ৩৯টি।

বেক্সিমকো গ্রুপের তত্ত্বাবধানে ডিটিএইচ ‘আকাশ’-এর মাধ্যমে ১৩০টির বেশি চ্যানেল চলমান। অথচ তাদের লাইসেন্স আছে ১২১টি চ্যানেল দেখানোর। বাকি ৯টি চ্যানেল তারা অবৈধভাবে দেখাচ্ছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। লক্ষণীয়, বেক্সিমকোর প্রতিষ্ঠানটি শুধু ভারতীয় টিভি চ্যানেলই দেখায় দেড় শতাধিক।

একটি প্রতিষ্ঠান কিভাবে অবৈধ টেলিভিশন সম্প্রচার চালিয়ে যেতে পারে, সেটি গুরুতর প্রশ্ন।

টেলিভিশন চ্যানেল মালিকরা বলছেন, সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও নজরদারির অভাবে দেশে আকাশ সংস্কৃতির নামে ‘আকাশ অপসংস্কৃতি’ ছড়িয়ে পড়ছে। ক্যাবল অপারেটরদের সমিতি বলছে, সুষ্ঠু মনিটরিং ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে দেশ শতকোটি টাকার রাজস্ব-বঞ্চিত হচ্ছে।

বিদেশী টিভি চ্যানেল প্রদর্শনের বিষয়ে চ্যানেল মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অনেক আগেই আইন করেছিল, বিদেশী চ্যানেলকে ক্লিন ফিড (বিজ্ঞাপন ছাড়া) চালাতে হবে; কিন্তু চ্যানেলগুলোকে সে আইন মানতে বাধ্য করা যায়নি। অনেকসময় ক্যাবল অপারেটররাও সিনেমা, বিজ্ঞাপন এমনকি অনুষ্ঠান প্রচার করে। এসবও বেআইনি; কিন্তু দেখার কেউ নেই। এসব ঘটনা বিস্ময়কর ও অগ্রহণযোগ্য।

ভারতে বাংলাদেশের একটিও টিভি চ্যানেল দেখানোর সুযোগ নেই; অথচ বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে দেখানো হচ্ছে ভারতের চ্যানেল। আর সেটি করছে পতিত ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান। এটি যে দেশকে ভারতের সাংস্কৃতিক উপনিবেশে পরিণত করার আওয়ামী কর্মসূচির অংশ তা স্পষ্ট।

ভারতীয় টিভি চ্যানেলের নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়ছে। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্য হুমকির মুখে পড়েছে। বিদেশী বিনোদন, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস এমনকি ভাষাও রপ্ত করছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। ভারতীয় চ্যানেল দেখে কেউ ইতিবাচক কিছু গ্রহণ করেছে এমন দৃষ্টান্ত কমই পাওয়া যাবে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান সময়ে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, তারও অন্যতম কারণ আকাশ সংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবল।

এভাবে চলতে পারে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সুযোগ এসেছে নতুন করে ভাবার। সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে।