রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জরিপ ও শুমারির তথ্য-উপাত্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার। নিজেদের অর্থনৈতিক সাফল্য ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর জন্য তারা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বিবিএসকে এ কাজে নগ্নভাবে ব্যবহার করেছে। মাথাপিছু আয়, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি- এ ধরনের সূচক ঘষামাজা করে তাদের চাহিদামাফিক তৈরি করতে বিবিএসকে বাধ্য করা হয়। মুক্ত পরিবেশে এখন এ সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানিয়েছেন। তারা একটি স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন চায়। বিবিএসকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে এখানেও কার্যকর সংস্কার দরকার। স্বাধীনতার পাশাপাশি তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

বিবিএসের জনবলের ৯৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সংস্থার মোট জনবল চার হাজার ৩৫৮ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে চারটি সংগঠনের চার হাজার ১৮৮ জন সদস্য স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন চান। এ দিকে এ সম্পর্কিত সংস্কার কমিশন এ ব্যাপারে সুপারিশ পেশ করতে যাচ্ছে। তাতে স্বাধীন কমিশন গঠন এবং এর সুবিধা ও প্রক্রিয়া প্রস্তাবের মধ্যে বিস্তারিত থাকবে।

বিবিএস পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। জনমিতি, স্বাস্থ্য, শ্রম ও মজুরি, শিল্প উৎপাদন, মূল্যসূচক, দারিদ্র্য ও পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত শুমারি ও জরিপ পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনেও নানা জরিপ তারা করে। এগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত জনস্বার্থে প্রকাশ করে।

শেখ হাসিনার সরকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো বিবিএসকেও কব্জা করে নিয়েছিল। ফলে এটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। সে কারণে হাসিনার আমলে পরিচালিত শুমারি ও পরিসংখ্যান নিরপেক্ষতা এবং গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এতে করে সরকারি নীতি প্রণয়নে গোঁজামিলের আশ্রয় নিতে হয়। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি সেক্টরে সীমাহীন বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করতে না পারায় বিভিন্ন বিভাগের কাজ পরিচালনায় বিপত্তিতে পড়তে হয়েছে সরকারকে।

সরকারের অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি বিবিএসকে স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশনে রূপান্তরের সুপারিশ করেছে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও অনুরূপ সুপারিশ করেছে। তারা বিবিএসকে নিজস্ব জনবল নিয়োগের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুপারিশ করেছে, যেটি জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে।

প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান জনবলের দাবি এসব সুপারিশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে স্বাধীনতার অপব্যবহার যাতে না হয় সে জন্য কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের নীতি-নির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্নয়ন মূল্যায়নে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্ত জরুরি। বিবিএসের বিপুল জনবল থাকার পরও বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবে তারা সে কাজটি করতে পারেনি। সরকারের বর্তমান উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন তাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এ প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে। সংস্থাটিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত জবাবদিহিমূলক এবং দায়িত্বশীল করতে হবে।