যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল সেনাবাহিনী। গত সোমবার মধ্যরাত থেকে গাজার উত্তরাঞ্চল, গাজা সিটি, দেইর আল বালাহ, খান ইউনিস ও রাফাসহ প্রায় পুরো গাজায় চালানো ভয়াবহ এ হামলায় নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ৪১৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ৬০০ জন। গাজায় যখন তখন গণহত্যা চালানো যেন ইসরাইলের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
পবিত্র রমজান মাসে সারা বিশ্বের মুসলমানদের সাথে নির্যাতিত গাজাবাসী যখন সিয়াম সাধনা পালন করছে তখন তাদের ওপর ইসরাইলের এ ধরনের দানবীয় হামলা মেনে নেয়া যায় না। গাজাবাসীর ওপর ইসরাইলি হামলায় আমরা ক্রুদ্ধ, ব্যথিত ও মর্মাহত। আমরা এই হামলার তীব্র নিন্দা, ধিক্কার ও প্রতিবাদ জানাই।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে ৪৮ সহস্রাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরাইল। আহত ও বাস্তুচ্যুত হয় অসংখ্য ফিলিস্তিনি। এরপর গত জানুয়ারিতে ইসরাইলের সাথে হামাসের দুই ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। ধারণা করা হচ্ছিলÑ যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকবে কিন্তু ইসরাইলের এই হামলা, সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। যদিও হামলার পর গাজার মুক্তিকামী মজলুম মানুষদের সংগঠন হামাস নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার কোনো ঘোষণা দেয়নি; বরং হামাসের মুখপাত্র আবদেল লতিফ বলেছেন, তারা এখনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলতে চান।
গাজায় ইসরাইলের এমন হামলার মূলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আশকারা। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি গাজাবাসীকে গাজা থেকে সরিয়ে দিয়ে অন্যত্র পুনর্বাসন করতে চান। ট্রাম্পের কথায় এটিই স্পষ্ট হচ্ছে, তিনি চান না গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ হোক। বন্ধ হোক ফিলিস্তিনে ইসরাইলের দখলদারিত্ব; বরং ট্রাম্প ও ইসরাইলের এখন একটিই উদ্দেশ্যÑ গাজাবাসীকে নিশ্চিহ্ন করা কিংবা যেকোনো মূল্যে তাদেরকে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা।
নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি যুদ্ধ বন্ধ করবেন। কিন্তু গাজাবাসীকে উচ্ছেদ করার যে বক্তব্য তিনি দিয়েছেন তাতে তার স্ববিরোধী অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। এখনো যদি গাজা যুদ্ধ চলতে থাকে তাহলে ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের বক্তব্য ভাঁওতাবাজি বলে প্রমাণ হবে।
গাজার প্রতি ইসরাইলের এই আগ্রাসী আচরণের শেষ কোথায়? ২০২৪ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। এরপরও তাদের কিছুই হয়নি। ফিলিস্তিনে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধের দায়ে আইসিসিতে এখনো মামলা চলমান রয়েছে। কে জানে এসব মামলা দিয়ে আদৌ ইসরাইলের বিচার করা সম্ভব হবে কি না! ইসরাইলের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে গাজাবাসীর ওপর এমন গণহত্যা চলতেই থাকবে।
গাজায় ইসরাইলের গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ থামাতে হবে। থামাতে হবে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্ব। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র ও মানবতাবাদী ইউরোপের রাষ্ট্রনেতাদের এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের মদদে গাজার মানুষকে হত্যা করে নিঃশেষ করবে আর সমগ্র বিশ্বের মানুষ নীরব দর্শক হয়ে শুধু দেখবেÑ তা হতে পারে না। গাজায় মানবতাকে বাঁচাতে বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে। থামাতে হবে গাজার যুদ্ধ। ফিরিয়ে আনতে হবে শান্তি।