ঢাকায় সম্প্রতি চীন-বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে চীনের ১৪৩টি কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ২৫০ বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী নেতা যোগ দেন। কোম্পানিগুলোর মধ্যে চীনের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ছিল। প্রসঙ্গত বলা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদল আর কখনো আসেনি। চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাওয়ের নেতৃত্বে এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।

সম্মেলনে শতাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই দেশের উদ্যোক্তারা সম্ভাব্য যৌথ প্রকল্প নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। এতে করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের সামনে বড় সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

ওয়েনতাও এই সম্মেলনের পরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা সুনির্দিষ্ট কিছু খাতের কথা বলেন। বিশেষ করে কৃষি এবং গভীর সমুদ্র ও নদীনির্ভর মাছ চাষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামকে একেকটি উৎপাদন ইউনিটে রূপান্তর করা সম্ভব’।

চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও এসব বিষয়ে তার দেশের বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহের কথা জানিয়ে কৃষির কোন কোন খাতে পূর্ণমাত্রায় সহযোগিতা সম্ভব সে বিষয়ে জানতে চান। কৃষিভূমির উন্নয়ন, পানি সংরক্ষণ ও আধুনিক চারা রোপণ প্রযুক্তির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান।

বাংলাদেশ শিল্প খাতের বিকাশে আগ্রহী; কিন্তু বাস্তবতা এই যে, আমাদের অর্থনীতির বড় অংশ এখনো কৃষিনির্ভর। কৃষি খাতে বিপুল সম্ভাবনা এখনো অনাবিষ্কৃত। তা ছাড়া একটি জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে রয়েছে বিশাল ভোক্তাশ্রেণী। তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তাবাজারে পরিণত হবে। চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী এই পূর্বাভাস সম্পর্কে সচেতন। যেকোনো বিনিয়োগকারীর জন্য এটি একটি সুযোগ। চীনের প্রতিনিধিদলে সে দেশের বেশ কিছু সেরা কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব ছিল। তারা বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে এখানে বিনিয়োগের বিষয়ে আশ্বস্ত এবং এখানে বিনিয়োগ নিয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।

চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়েনতাও মাছ ও সামুদ্রিক অর্থনীতি প্রসঙ্গে চীনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার প্রযুক্তিতে চীন বিশ্বে অগ্রণী।

চীনের মন্ত্রী দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতা কেবল ব্যবসায়িক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণার ক্ষেত্রেও যৌথভাবে কাজ করার কথা বলেন। বাংলাদেশ এ যৌথ গবেষণায় অংশ নিলে এ দেশের পাট চীনের জন্য উপযুক্ত পণ্য হয়ে উঠবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। চীন বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০ কোটি ডলারের পাট আমদানি করে, যা বাংলাদেশের মোট পাট রফতানির প্রায় ১০ শতাংশ। পাটপণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারলে এ পরিমাণ বহুগুণে বাড়তে পারে।

আমাদের দৃঢ় প্রত্যয় এই যে, এ বাণিজ্য সম্মেলন দু’দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে; কিন্তু এ জন্য দেশে সামাজিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। নানা কারণে সে পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশে নতুন অগ্রযাত্রার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন হাতছাড়া না হয়- সেটি রাজনীতিকদের নিশ্চিত করতে হবে।