নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই এমন একটি সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। সরকার জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট এলাকায় নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা মাঝপথে অর্থ লোপাট বা দুর্নীতির সুযোগ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

উদ্বোধনের দিনই তালিকাভুক্ত হাজারো নারীর হিসেবে টাকা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির অভিযোগ ছিল; সেই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতির ওপর জোর দেয়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে একই সাথে এ কর্মসূচিকে ঘিরে কিছু বাস্তব প্রশ্ন ও শঙ্কার কথাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একটি পরিবারের জন্য মাসে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা কতটা কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই অর্থ হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দেবে; কিন্তু দারিদ্র্যচক্র কি ভাঙতে পারবে? নগদ সহায়তা যদি দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে এবং উৎপাদনমুখী কোনো কার্যক্রম না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এটি নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি তৈরি করবে।

আরো একটি বড় প্রশ্ন হলো— প্রকল্পটি চালানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদে এর টেকসই হওয়া আদৌ সম্ভব কি না। এ কর্মসূচি ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারণ করে কোটি কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে এর জন্য বিপুল অর্থের দরকার হবে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় বাজেটের ওপর তা বড় চাপ তৈরি করবে। বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর সাথে এর সমন্বয় করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই এই প্রকল্পকে দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যেতে হলে অর্থায়নের উৎস, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো খুব সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন। অতীতে বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিতে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। সরকার বলছে, সফটওয়্যারভিত্তিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দাবি। তবে বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং তালিকা প্রস্তুতের প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ হয়েছে, সেটি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি; যাতে প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ে না যায় এবং অপেক্ষাকৃত সচ্ছল কেউ এই সুবিধা ভোগ করতে না পারে।

এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর। প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়া, দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করে তোলার দায়িত্ব এখন সরকারের। সরকারের প্রতি প্রত্যাশা, এ উদ্যোগ যেন স্বচ্ছতা ও সততার সাথে বাস্তবায়ন হয় এবং দেশের অসহায় মানুষ সত্যিকার অর্থে সুফল ভোগ করতে পারে।