জাতির ঘাড়ে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন চাপিয়ে দেয়া শেখ হাসিনার বিচারকার্যক্রম চলছে। হাসিনাসহ ১২ জনকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ গেজেট আকারে প্রকাশ হচ্ছে। এটি হলো- ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি প্লট বরাদ্দ নেয়াসংক্রান্ত মামলা। এর চেয়েও অনেক গুরুতর ও মারাত্মক অপরাধ করেছেন হাসিনা। দেশবাসী আশা করে, তার সেসব গুরুতর অপরাধের বিচার আগে হওয়া দরকার। জাল-জালিয়াতি ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা, গুম-খুন-গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা, দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী কর্মকাণ্ড, লুটপাট ও অর্থপাচারের সুযোগ করে দিয়ে জাতীয় অর্থনীতি পঙ্গু করার মতো অপরাধের বিচার বেশি জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই এই বিচার সম্পন্ন হবে- এটিই জনগণের প্রত্যাশা। কারণ নির্বাচনের পর কোনো নির্বাচিত সরকারের পক্ষে নানামুখী চাপ এড়িয়ে বিচার করা সম্ভব হবে কি-না সংশয় আছে।
গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তলব করাও এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বড় অগ্রগতি। এর পাশাপাশি হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি অবৈধ ও প্রহসনের নির্বাচন নিয়ে তদন্তের প্রক্রিয়াও শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আমরা এই উদ্যোগে স্বাগত জানাই। মূলত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনই ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা ও তা দীর্ঘায়িত করার ভিত্তি। ‘ভোটারবিহীন’, ‘নৈশভোটের’ এবং ‘আমি-ডামির’ নির্বাচন হিসেবে খ্যাত ওই তিনটি নির্বাচনের দায় প্রথমত শেখ হাসিনার। তার পরই মুখ্য দায় সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশনাররা সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের শপথ নিয়েও সে দায়িত্ব পালন করেননি অথবা ব্যর্থ হয়েছেন। তারা নিৎসন্দেহে শপথ ভঙ্গ করেছেন। নির্বাচনের নাটক করে শেখ হাসিনার ক্ষমতা প্রলম্বিত ও নিরঙ্কুশ করার ব্যবস্থা করেছেন, গোটা দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অপরাধ করেছেন। শাস্তি তাদের প্রাপ্য। শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করতে নির্বাহী বিভাগসহ নানা খাতের কর্তাব্যক্তিরা প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। তাদেরও শাস্তি হওয়া জাতির ভবিষ্যতের স্বার্থেই জরুরি।
কিন্তু এক্ষেত্রে নানা জটিলতা আছে। হাসিনা নানা অবৈধ আইন করে নির্বাচন কমিশনসহ অনেককে দায়মুক্তির ব্যবস্থা করে গেছেন। স্বৈরাচারের দোসর আইনজীবীসহ অনেকেই বলার চেষ্টা করছেন, দায়মুক্তি থাকায় অপরাধীর বিচার করার সুযোগ নেই। এটি একেবারেই খোঁড়া যুক্তি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িতদেরও দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল। তার পরও শেখ মুজিব হত্যার বিচার ও হত্যাকারীদের চরম দণ্ড হয়েছে। যুক্তি একটিই- সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন বৈধ হতে পারে না। সেটি ইনডেমনিটিই হোক বা অন্য যেটিই হোক।
আমরা আশা করব, অন্তর্বর্তী সরকার আইনি প্রক্রিয়ায় হাসিনার প্রণীত দায়মুক্তির আইন বাতিল ও অকার্যকরের ব্যবস্থা করবে এবং নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য দায়ী প্রতিটি অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনবে।