বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি একমুখী করা হয়েছিল। ধীরে ধীরে শৃঙ্খলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছিল। হাসিনার পতনের আগে চীন সফরে তা দৃশ্যমান হয়। ভারতের ধরিয়ে দেয়া ফর্দ অনুসরণ করে চীন সফর করেন শেখ হাসিনা। তার ফলও হাতেনাতে পেয়েছিলেন তিনি। চীন সরকার তাকে অনেকটা অপমানিত করে বিদায় দেয়। তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি এতটা অবনতি হয়েছিল, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাসগুলো সমন্বয় করে ভারতের স্বার্থে কূটনীতি পরিচালিত করত। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দিল্লির কূটনৈতিক আগ্রাসন থেকে দেশকে ক্রমান্বয়ে উদ্ধার করছে। সম্প্রতি ডিপ্লোম্যাটের এক বিশ্লেষণে মন্তব্য করা হয়েছে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ভারতকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে সরে এসে আরো বৈচিত্র্যময় কূটনৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
পত্রিকাটির ভাষ্যমতে, ভারতের প্রভাব থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি অনুসরণ করছে। চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীর করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার প্রথম সফরে চীনে যান। দেশটির সাথে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতাস্মারক সই করেন। চীনও আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশে তার বিভিন্ন অংশীদারের সাথে বোঝাপড়া তৈরি করে নিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠক করেছেন চীনা রাষ্ট্রদূত। তাদের উপর্যুপরি চীন সফরে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারতের চাপে দু-দেশের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যক সম্পর্কগুলো আবার চালু হচ্ছে। চীনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাসিনাকে চাপ দিয়ে ভারত যা অনেকটা ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখত। সেই যুগেরও অবসান হয়েছে। এখন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অগ্রগতিতে ভারতের কোনো প্রভাব নেই। সম্প্রতি শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র্রের সাথে দরকষাকষিতে ভারতের চেয়ে ভালো সুবিধা আদায় করে নিতে পেরেছে ঢাকা। স্বাধীনভাবে বাংলাদেশের কূটনীতি পরিচালনার সফলতা অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত বাধা হয়েছিল। ওই অঞ্চলের ধনী দেশগুলোর বিনিয়োগ প্রস্তাব হাসিনা এড়িয়ে যান। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সৌদি আরবের কোম্পানি আরামকো তেল শোধনাগার প্রকল্প। যথাসময়ে সাড়া দিলে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের তেলবাণিজ্যের কেন্দ্র হতে পারত। যথাযথ গুরুত্ব না দেয়ায় প্রকল্পটি সফলতা পায়নি। একই ধরনের বড় বিনিয়োগ এসেছিল দক্ষিণ কোরিয়ার থেকে, সেটিতে আগ্রহ দেখানো হয়নি।
মুসলিম বিশ্বের সাথে হাসিনার সময়ে একধরনের নড়বড়ে সম্পর্ক ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ কাতারের সাথে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর সাথে সম্পর্কে নতুন এক মাত্রা দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন বিপদে এসব দেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও হাসিনা সরকারের কূটনীতিতে তারা গুরুত্ব হারায়।
বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের এক বিশাল দেশ। এ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ তরুণ কর্মক্ষম। তাই আমাদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে দরকার স্বাধীন বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সফলভাবে তার সূচনা করেছেন। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করলে দেশ নিঃসন্দেহে শুধু এগিয়ে যাবে না, বিশ্ব মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাও করতে সক্ষম হবে।