২৬ মার্চ, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পূর্ণ হলো। গৌরবময় এই দিনটি উদযাপনের মধ্য দিয়ে নতুন দিগন্তে ছুটে চলার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হবে জাতি। তবে এবারের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য আমাদের কাছে বিশেষভাবে অর্থবহ। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানে মুক্ত বিহঙ্গের মতো এবারের স্বাধীনতা দিবস বিপুল উৎসাহে উদযাপন করবে দেশবাসী। এ দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয় স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নকারী সেসব বীরকে। সেই সাথে আমরা কিছুটা সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারি ৫৪ বছরের অর্জন নিয়ে। কিন্তু একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে এখনো অনেকটা পথ বাকি।
এ কথা সত্যি যে, একটি জাতির জাতীয় জীবনে ৫৪ বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়। বিগত কয়েক যুগে জাতিসত্তার যে বিকাশ ও উন্নয়ন হয়েছে সেটি লক্ষণীয়। তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সমসাময়িক কালে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলো কিংবা যেসব দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে আমাদের বিশেষ মিল রয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই প্রভূত উন্নতি করেছে। যেমন সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। দেশ দু’টি এখন বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ। এছাড়া ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতা পাওয়া দক্ষিণ কোরিয়া রীতিমতো বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি হওয়ার পথে। এসব দেশ শুধু যে জনসাধারণের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পাল্টে দিয়েছে তাই নয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও সক্ষম হয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের একটি উজ্জ্বল পটভূমি রয়েছে। এ দেশের মানুষ শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের অভিপ্রায়ে রাষ্ট্র গঠন করেছেন। আমাদের স্বাধীনতা চড়া দামে কেনা। স্বাধীনতার চেতনা ছিল শোষণ-নিপীড়নমুক্ত অবাধ মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা যেখানে পূর্ণ গণতন্ত্র ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। অথচ স্বাধীনতার পর এবং সম্প্রতি ফ্যাসিস্ট হাসিনার জমানায় গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়। মানুষের মতপ্রকাশের অধিকারসহ সব অধিকার কেড়ে নেয়া হয় নিষ্ঠুরভাবে। নির্বাচনব্যবস্থা অকার্যকর করে ফেলা হয়। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ আইনের ঊর্ধ্বে থেকে সীমাহীন স্বাধীনতা ভোগ করে। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আমাদের একটি উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকতে পারত।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আমাদের উত্তরণের কথা বলা হলেও বাস্তবে দেশে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ধনী-গরিব ব্যবধান বেড়েছে। সমাজে এখনো আক্ষরিক অর্থে অসহনীয় দারিদ্র্য বিরাজ করছে। অন্য দিকে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নেই সাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এক শ্রেণীর জন্য দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ সঞ্চিত করার পথ খুলে দেয়া হয়েছিল হাসিনার আমলে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি অনেক আগে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারতাম না কিংবা দেশ দাঁড় করাতে পারতাম না উন্নত দেশের কাতারে? কেন পারিনি, তা জানতে স্বাধীনতা দিবসের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে।
ফ্যাসিবাদের অবসানে আমাদের সম্ভাবনার দুয়ার যেভাবে খুলেছে তা কাজে লাগাতে পারলে সব নাগরিকের জীবনে ধরা দিতে পারে কাক্সিক্ষত চাওয়া। এ জন্য দেশে নতুন চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। করতে হবে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রসংস্কার। যাতে সব নাগরিকের ন্যায্য গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত হয়।