বিগত সময়ে দেশের জেলায় জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে হাসিনার জমানায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়েছিল। বাস্তবতা হলো, পাবলিক ইউনিভার্সিটির সংখ্যা বাড়লেও আমাদের শিক্ষার গুণগত মান এখন তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান যে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেই, এর প্রমাণ- দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিও বৈশ্বিক সূচকে হাজারের মধ্যে স্থান না পাওয়া। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কর্মমুখী নয়। বেশির ভাগ সনাতন পদ্ধতির হওয়ায় প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হলেও তাদের মানসম্পন্ন কাজের সুযোগ হচ্ছে না। ফলে ক্রমাগত বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। এতে করে জাতীয় জীবনে এখন জনমিতির যে সুবিধাজনক সময় চলছে তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা।
এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাতটি বড় সরকারি কলেজ নিয়ে নতুন আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বছরের মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অধ্যাদেশ জারি হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হবে ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’। এর অধিভুক্ত থাকবে রাজধানীর ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেছা মহিলা কলেজ, বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ।
উল্লেখিত কলেজগুলো একসময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর এ সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়; কিন্তু অধিভুক্ত করার পর থেকে যথাসময়ে পরীক্ষা নেয়া, ফল প্রকাশসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা। আট বছরে ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে বড় রূপ নেয়। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত জানুয়ারিতে সাতটি কলেজকে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করার কথা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে এ সাত কলেজের জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি তুলে ধরে। জানানো হয়, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ভিত্তিতে হবে না। ‘হাইব্রিড মডেলে’ চলা নতুন ধরনের এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ শতাংশ ক্লাস হবে অনলাইনে আর ৬০ শতাংশ ক্লাস হবে শ্রেণিকক্ষের উপস্থিতিতে। তবে সবধরনের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে সশরীরে। প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম চার সেমিস্টার নন-মেজর কোর্সে, পরের চার সেমিস্টার ডিসিপ্লিন অনুযায়ী মেজর কোর্সে পড়বেন। পঞ্চম সেমিস্টারে শর্তপূরণ সাপেক্ষে শিক্ষার্থী ইচ্ছা অনুযায়ী ডিসিপ্লিন পরিবর্তন করতে পারবেন; কিন্তু ক্যাম্পাস পরিবর্তন নয়।
নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনকার মতো একেকটি কলেজে সব বিষয় পড়াশোনা হবে না। এক বা একাধিক কলেজে স্কুলভিত্তিক ক্লাস হবে। সাতটি কলেজকে চারটি স্কুলে বিভক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানের আধার। দেশে আরেকটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অবশ্যই আনন্দের। তবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার জন্য যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে তার লক্ষ্য যেন হয় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর শিক্ষার্থীরা যেন দেশ-বিদেশে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে দেশের মঙ্গলে তাদের মেধার প্রয়োগ করতে পারেন।