দেশের প্রাণ-প্রকৃতির জন্য অপরিহার্য উপাদান পানি। পানির অভাবে পরিবেশের বিপর্যয় অনিবার্য। এ থেকে রক্ষা পেতে আমাদের চাই টেকসই পানি-ব্যবস্থাপনা। কিন্তু পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা স্বাধীনতা-উত্তর ৫৩ বছরে আমরা প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। উল্টো দেখা যাচ্ছে, পানির আধার নদ-নদী-নালা-খাল-বিল দখল, দূষণ ও নির্বিচারে ভরাটে দেশ এখন এক পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। এতে করে প্রাণ-বৈচিত্র্যের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, ঠিক তেমনি মানুষের নিত্যদিন গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে।

লক্ষণীয়, দেশের নদ-নদী, খাল-বিল দখলকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয় না। ফলে জলাধার দখলকারীরা বেপরোয়া। এর জন্য দায়ী আমাদের জাতীয় উদাসীনতা। পরিণতিতে পানির আধারগুলোর মরণদশার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

সারা দেশের মতো অবহেলা-অযত্ন, অপরিকল্পিত বাঁধ দেয়া এবং দখল ও দূষণে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় এক সময়ের বড় বড় ছয়টি খাল এখন হাজা-মজায় পরিণত হয়েছে। নয়া দিগন্তের আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ উপজেলার একসময়ের খরস্রোতা ছয়টি খাল প্রভাবশালীদের দখলে, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, খালখনন প্রকল্পের কাজে অনিয়ম ও বাঁধের কারণে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। খালগুলো হলো ইছামতি, সাপমারা, শাহ মোহছেন আউলিয়া, কেয়াগড় কান্দুরী, ইজারা বিলের সংযোগ খাল ও শ্রীমতি খাল। এসব খালের দুই তীরের কৃষকরা তাদের চাষাবাদে খালের পানি ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন খালগুলো থেকে প্রয়োজনের সময় সেচ দিতে পারছেন না তারা। সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকদের ফসল ফলাতে বিকল্প ব্যবস্থায় সেচ দিতে হচ্ছে; এতে বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা ফেলায় জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। এসব খালের তীরবর্তী এলাকায় পানি দূষণে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। সেই সাথে খালগুলোতে পানি প্রবাহ না থাকায় মৎস্য চাষও করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী (বিএডিসি) আজমানুর রহমান বলেন, নানাস্থানে বাঁধ ও ময়লা-বর্জ্যে ভরে যাওয়ায় আগের মতো জোয়ার ভাটা আসতে না পারায় পানির প্রবাহ নেই বললে চলে। যে কারণে কৃষক সেচসুবিধা পাচ্ছেন না ।

নদী-খাল ও জলাশয় আবহমান কাল ধরে আমাদের পানির চাহিদা মিটিয়ে আসছে। দেশের প্রকৃতি সজীব রাখছে। সবখানে প্রাণের সঞ্চালনে দেশের জলাধারগুলো পানির অন্যতম উৎস। কিন্তু আমাদের দায়িত্বহীনতায় প্রাকৃতিক এসব জলাধার বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে।

সঙ্গত কারণে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় জলাধারগুলোর সংরক্ষণ করা আমাদের গুরু দায়িত্ব। সারা দেশের নদ-নদী খাল-বিল দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদফতরের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সরকারি এসব সংস্থা নিজ নিজ কাজে গাফিলতি করায় আনোয়ারাসহ সারা দেশের বেশির ভাগ জলাধার এখন মরণদশায়।