খুলনার পাইকগাছার হাট-বাজারে দীর্ঘ দিন ধরে বিক্রি হচ্ছে আখ ও খেজুরের ভেজাল গুড়। স্থানীয় একটি চক্র গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত চিনির সিরা বা নালিগুড়ের সাথে রঙ ও নানা রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে তৈরি করছে এসব ভেজাল গুড়, যা খেয়ে এলাকাবাসী অজান্তেই আক্রান্ত হচ্ছে পেটের পীড়াসহ নানা রোগে। এই ভেজাল গুড় খেয়ে কিডনি রোগে এমনকি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ারও ঝুঁকি আছে বলে জানান পুষ্টিবিজ্ঞানীরা; কিন্তু এ বিষয়ে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কারো কোনো তৎপরতা নেই।

গতকাল নয়া দিগন্তে প্রকাশিত পাইকগাছা প্রতিনিধির এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনির পালপাড়ায় তৈরি হচ্ছে এসব ভেজাল গুড়। সেখানে ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছে কৃত্রিম গুড় তৈরির কারখানা। খবরে বলা হয়, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই গড়ে উঠছে এসব কারখানা। রমজান মাস সামনে রেখে কারখানাগুলোতে ব্যাপক হারে কৃত্রিম গুড় উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ জাহের বলেছেন, এসব গুড় খেলে কিডনি ও লিভার অকেজো হওয়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ শিশুদের চিন্তাশক্তি হ্রাস পায়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।

এসব বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ বা লেখালেখি করলে সাধারণত কোনো প্রতিকার হয় না। দেশে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনের বিরুদ্ধে সরকারের অনেক দফতর আছে। আছে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান-বিএসটিআই। সংস্থাটি আসন্ন রমজানে সারা দেশে অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। এটি তাদের রুটিন বাঁধা কাজ। এতে জনগণের আশান্বিত হওয়ার কিছু নেই। সংস্থাটি ২০১৯ সালে রমজানের আগে খোলাবাজার থেকে ৪০৬টি পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে তাদের ল্যাবে পরীক্ষা করে। তাতে ৫২টি পণ্যেই ভেজাল পাওয়া যায়। ভেজাল পণ্যের মধ্যে ছিল সরিষার তেল, চিপস, খাবার পানি, নুডলস, হলুদ ও মরিচের গুঁড়া, আয়োডিনযুক্ত লবণ, লাচ্ছা সেমাই, চানাচুর, বিস্কুট এবং ঘি। অনেক বড় ও বিখ্যাত কোম্পানির পণ্যেও ভেজাল পাওয়া যায়।

এটি রীতিমতো উদ্বেগজনক। কিন্তু সেই ঘটনায় কারো বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জনস্বাস্থ্যের ওপর এর বিরূপ প্রভাবও স্পষ্ট। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে দেশে ক্যান্সারসহ জটিল রোগব্যাধি বাড়ছে। শুধু তাই নয়, জাতিগতভাবে আমরা যে মেধাশূন্য হয়ে পড়ছি এবং জ্ঞানের দিক থেকে বিশ্বের অন্য সব জাতি থেকে পিছিয়ে পড়ছি তার পেছনে ভেজাল খাদ্য গ্রহণের সম্পর্ক আছে।

দেশে খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধানসহ কঠোরতম আইন আছে; কিন্তু প্রয়োগের হার শূন্য বলা যায়। গত ৫৪ বছরের স্বাধীন দেশে খাদ্যে ভেজাল দেয়ার জন্য কারো মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের জেল হয়েছেÑ এমন দৃষ্টান্ত একটিও নেই। এর অর্থ হলো, কেউ আন্তরিকভাবে চায় না খাদ্যে ভেজাল বন্ধ হোক। শুধু খাদ্যপণ্য নয়, দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মতো পণ্যও ভেজাল বা নকল হয়। দেখার সত্যিই কেউ নেই।

অথচ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার কোনো উপায় নেই। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে সবার সচেতনতা জরুরি।