জায়নবাদী ইসরাইল গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক সব নিয়ম উপেক্ষা করে ইরানে ফের বর্বর বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে ইরানের প্রায় ১০০ বেসামরিক নাগরিক ও সশস্ত্রবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধানসহ অন্তত ১০ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যক্তিত্ব, কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক শ’ নাগরিক। ইরানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। এতে একজন ইসরাইলি নাগরিক নিহত হয়েছে।

‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে ইসরাইলের এ হামলার লক্ষ্য ছিল পরমাণুসক্ষমতা অর্জনে ইরানের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করা। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের ভেতরে হামলা আন্তর্জাতিক আইনসহ যেকোনো বিচারে অবৈধ। ইসরাইল বরাবর ইরানে হামলা চালিয়ে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করার ঘোষণা দিয়ে আসছিল। এর আগেও বহুবার হামলা করেছে। অনেক বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। একজন হামাস নেতাকে ইরানে তার আবাসকক্ষের ভেতরে খুন করেছে। এমনকি ইরানের একজন প্রেসিডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তাদের হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহতের ঘটনায়ও ইসরাইল জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়। এসব হামলার পেছনে সব সময় বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল এবং আছে। কিন্তু ইরান কখনোই পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায়নি।

সব শেষ ইসরাইলি হামলা ছিল নিঃসন্দেহে লক্ষ্যভেদী ও সুনিপুণ। এ হামলায়ও যুক্তরাষ্ট্রের সায় রয়েছে মনে করার স্পষ্ট কারণ দৃশ্যমান। ফলত এ হামলা ইসরাইলের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে কোনোভাবে সহায়ক হওয়ার নয়। হামলার প্রথম বিরূপ ফল হবে, আজ রোববার তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরমাণুবিষয়ক নির্ধারিত আলোচনা ভণ্ডুল হওয়া। ইতোমধ্যে ইরান বলেছে, আমেরিকার মদদে ইসরাইলি হামলার পর এ আলোচনার কোনো যুক্তি নেই। সম্ভবত ইরান এ আলোচনায় যাচ্ছে না। এ ঘটনার আরো গুরুতর প্রতিক্রিয়া এমন হতে পারেÑ ইরান এখন পরমাণু অস্ত্র বানানোর কাজ জোরেশোরে শুরু করতে পারে। কারণ জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেহরানের হাতে অন্য কোনো বিকল্প থাকছে না।

ইরান পরমাণুসক্ষমতা নির্দিষ্ট পরিমাণে সীমিত রাখবে বলে ২০১৫ সালে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় ছয় জাতির যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) করেছিল, তা থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। তার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ইরানকে একটি নতজানু ও অধীনতামূলক শর্তে নতুন চুক্তি করতে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করছে। ওমান আলোচনার আগে এ হামলাও সেই চাপ তীব্র করার মরিয়া চেষ্টা বলা যায়।

এখন ইরান এনটিপি চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক কোনো দায় আর থাকবে না। এর বাইরে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা বাড়বে। তবে দেশটি বড় ধরনের সামরিক শক্তি প্রয়োগের দিকে যাবে বলে মনে হয় না। গত চার দশকের বেশি ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ানোর অবস্থায় নেই। আরব মিত্ররাও কেউ যুদ্ধ চায় না।

এমন পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ে পরমাণুসক্ষমতা অর্জন হতে পারে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার একমাত্র গ্যারান্টি।