চব্বিশের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী গণ-আন্দোলন একপর্যায়ে রূপ নেয় জনগণের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে। এতে অন্তত এক হাজার ৪০০ জন নিরস্ত্র মানুষ নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। দীর্ঘ একচ্ছত্র ক্ষমতা, দলীয়করণ, নিপীড়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ওই গণ-অভ্যুত্থান শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটায়। এই অভ্যুত্থান শুধু একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার হটায়নি; এটি দেশের নাগরিক সমাজে আমূল সংস্কারের আকাক্সক্ষা উচ্চকিত করে, যা এখন গণ-অভিপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত।

এই গণ-অভিপ্রায়ের বাস্তব রূপায়ণের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদের একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে। আগামীকাল ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে এ খসড়া চূড়ান্ত করতে চায় কমিশন।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গঠনমূলক পরিবর্তন আনতে ছয়টি সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হবে, সেগুলো নিয়ে তৈরি হবে জাতীয় সনদ। ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এর একটি খসড়া রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়েছে কমিশন। তাতে বলা হয়েছে, এ সনদের অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো আগামী জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করতে অঙ্গীকার করবে রাজনৈতিক দলগুলো।

কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সনদের বাস্তবায়ন হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের মূলধারায় ফেরা। এটি চব্বিশের শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার স্মারক হয়ে থাকবে।

গত বছরের অক্টোবরে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ফেব্রুয়ারিতে কমিশনগুলো প্রতিবেদন দেয়। পরে সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। এরপর ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা দুই ভাগে ভাগ করে আইনবিধি সংস্কার বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন সম্ভব এমন সুপারিশগুলোকে ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

অন্য দিকে ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে দলগুলোর সাথে আলোচনা করে ঐকমত্য কমিশন। প্রথম পর্বে ঐকমত্য হয়নি, এমন ২০টির মতো মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য কমিশন গত ৩ জুন থেকে সব দলকে একসাথে নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা শুরু করে। সে আলোচনা এখনো চলমান। এখন পর্যন্ত সংবিধানের মূলনীতিসহ মৌলিক সংস্কার সম্পর্কিত কিছু বিষয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে রাজনৈতিক দলগুলোর। আগামী নির্বাচনের প্রকৃতি কেমন হবে, তার অনেকটা জুলাই সনদের ওপর নির্ভর করবে। দ্বিতীয় পর্বে এখন পর্যন্ত ১২টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।

সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকারের একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৩০ জুলাই দুপুর ১২টার মধ্যে দলগুলোকে খসড়ার বিষয়ে মতামত বা পরামর্শ থাকলে তা দেয়ার অনুরোধ করেছে।

ঐকমত্য কমিশনের এ সনদ শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র নয়; বরং এটি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান, আত্মত্যাগ ও জনচেতনার প্রতিফলন এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জন্মের রূপরেখা। সঙ্গত কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সময়সীমার প্রতি শ্রদ্ধা এবং নাগরিক সমাজের শক্তিশালী নজরদারি অপরিহার্য। আশা করি, এটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বাঁকবদল হিসেবে বিবেচিত হবে।