চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতদের আত্মত্যাগের মূল্যায়নে অন্তর্বর্তী সরকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের আত্ম-কর্মসংস্থানের এই প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছিল একটি সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ঐতিহাসিক আন্দোলন। যেটি ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।

সহযোগী এক দৈনিকের খবর অনুযায়ী, এ প্রকল্পের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হবে। এতে ওইসব পরিবারের সদস্যরা আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

একথা সত্যি যে, এমন প্রকল্প আরো আগে নেয়া উচিত ছিল। দেরিতে হলেও চব্বিশের অভ্যুত্থানে হতাহতদের যে আমরা ভুলে যাইনি তা নিঃসন্দেহে শুভ লক্ষণ। তবে দেশবাসীর এ কথাও স্মরণে রয়েছে যে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসার অঙ্গীকার করা হলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন; তাদের যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবটি। ‘জুলাই ২০২৪ গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের আর্থসামাজিক অবস্থা সুদৃঢ়করণে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘আত্মকর্মসংস্থান সৃজন’ নামের প্রকল্পে এ অর্থ ব্যয় হবে। ইতোমধ্যে এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করবে যুব উন্নয়ন অধিদফতর।

সরকারি হিসাবে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ৮৩৪ জন শহীদ এবং ১২ হাজার ৪৩ জন আহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে নিহত প্রায় ১৪ শ’ জন। আর আহত ২০ সহস্রাধিক। আহতদের অনেকে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি বা অঙ্গ হারিয়েছেন। ফলে তারা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় শহীদ ও আহত পরিবারের বেশির ভাগ নিম্œ আয়ের মানুষ এবং শ্রমজীবী হওয়ায় তাদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আহত এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের আত্মকর্মসংস্থানে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নের প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, সব আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যকে প্রকল্পের উপকারভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিন বছরে ১২ হাজার ৮০০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা রয়েছে। প্রকল্পটি চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী ২৯ জুলাই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায়। অনুমোদন পেলে এটি দেশের ৬৪ জেলায় বাস্তবায়ন করা হবে।

আমাদের দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বলে একটি কথা চালু আছে। এই জটিলতার আবর্তে অনেক জনকল্যাণমুখী প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি, দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরের পর বছর লেগে যায়। আমরা আশা করব, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পের এমন পরিণতি যেন না হয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ফসল অন্তর্বর্তী সরকার এদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখবে, যাতে প্রকল্পের সুফল চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ এবং আহতদের পরিবার পেতে পারে।