দেশের তৈরী পোশাকশিল্প নানা হুমকির মুখে। বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন যেমন পোশাক রফতানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তেমনই আছে প্রতিবেশী দেশের বৈরী আচরণের প্রভাব। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত তার সীমান্তের স্থলবন্দর হয়ে বিদেশে বাংলাদেশী গার্মেন্টপণ্য রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বাড়তি অর্থ ব্যয়ে বিমানপথে পণ্য রফতানি করতে হচ্ছে। সামনে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বিপুল শুল্কের বোঝা। এগুলো আলোচনার মাধ্যমে হয়তো সুরাহা করা সম্ভব। তবে এর বাইরেও কিছু বাধা আছে যেগুলো রাষ্ট্রের নজরদারি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কাটিয়ে উঠতে হয়, যেমন চোরাচালানের সঙ্কট।
গতকাল একটি সহযোগী দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, ভারত থেকে বছরে ৫৪ হাজার কোটি টাকার বস্ত্র চোরাইপথে বাংলাদেশে ঢুকছে। রাজধানীর শপিংমল ও সাধারণ মার্কেটের কাপড়ের দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো ভারতীয় বস্ত্র ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এগুলোর বেশির ভাগই যে বৈধ উপায়ে আমদানি করা নয় সেটাও সবাই জানে।
সহযোগী দৈনিকের খবরে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় রীতিমতো চোরাচালানের সিন্ডিকেট সক্রিয়। এসব সিন্ডিকেটের লোকজনকে চোরাইকাপড় বাংলাদেশে পাঠাতে সাহায্য করে বাংলাদেশের কাস্টমস ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বাংলাদেশের বস্ত্র ব্যবসায়ীরাও এই পাচারের সাথে সরাসরি জড়িত।
একই সাথে বন্ড সুবিধায় আনা শুল্কমুক্ত সুতা নিয়েও চলে সিন্ডিকেটের অবৈধ কারবার। নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদীতে রয়েছে এই সিন্ডিকেটের অর্ধশতাধিক অস্থায়ী গোডাউন। এরা ক্রেতার সুবিধাজনক গন্তব্যে পৌঁছে দেয় সুতার চালান। চোরাচালানের কাপড় এবং সুতার সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশী বস্ত্রের বাজার ধ্বংস হচ্ছে। তৈরী পোশাক শিল্পও পড়ছে হুমকিতে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) একজন কর্মকর্তা সহযোগী দৈনিকের সাথে আলাপকালে জানান, ভারতীয় পোশাক বা বন্ডের সুতা-কাপড়ের সমস্যাগুলো সবার জানা। কিন্তু এ বিষয়ে এনবিআর কোনো ব্যবস্থা নেয় না। শুল্ক গোয়েন্দা বা বন্ড কমিশনারেট অবৈধ সুতা বা কাপড়ের বিষয়ে অভিযান চালাচ্ছে না।
চোরাচালান এবং বন্ড সুবিধার সুতা নিয়ে অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বস্ত্রশিল্পে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে, বাজার অস্থিতিশীল হয়ে স্থানীয় শিল্প-কারখানা অস্তিত্বসঙ্কটে পড়ছে। শ্রমিকরা বেকার হচ্ছেন। চোরাচালানের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। ব্যবসায়ীরাও মুনাফাবঞ্চিত হচ্ছেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চোরাচালানের মাধ্যমে আনা পোশাকের মূল্য হুন্ডিতে পরিশোধ করায় অর্থপাচার বাড়ছে। সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমছে।
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় খাত গার্মেন্ট। এই খাতের স্থিতি ও সুষ্ঠু বিকাশ ছাড়া দেশের অর্থনীতি টিকতে পারে না। পতিত স্বৈরাচারী সরকার দীর্ঘকাল ধরে দেশের অর্থনীতিতে পরনির্ভর করে রাখার লক্ষ্যে কাজ করেছে। এখন সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়াই সবার কাম্য। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে সম্পূর্ণ সজাগ ও সক্রিয় হতে হবে।
গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল শিল্প বাঁচিয়ে রাখার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের কোনো অবকাশ নেই।