জনশক্তি রফতানি খাতে বিদ্যমান সমস্যা কাটেনি; বরং তা আরো জটিল হয়ে উঠছে। দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশী তরুণ বিদেশে পাড়ি জমালেও তাদের বেশির ভাগ যাচ্ছেন অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে। অদক্ষ শ্রমিকের আয় খুব সীমিত। ফলে তাদের বিদেশে যাওয়ার খরচও অনেক সময় উঠে আসে না। এ ছাড়া অভিবাসী শ্রমিকরা প্রতারণা, শোষণ, বেতন-বৈষম্য এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো যেসব সমস্যার শিকার হন সেগুলো তো আছেই। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকারের পুরো সময় এসব সমস্যা তীব্রভাবে বেড়ে যায়। এ সময় নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান দূরের কথা, বিদ্যমান বাজারগুলোও ধরে রাখতে পারেনি নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে। অথচ প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির দ্বিতীয় প্রধান খাত।
আওয়ামী শাসনের অবসান হলেও জনশক্তি রফতানি খাতে সেই সময়ের অব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা থেকে গেছে। জানুয়ারির চেয়ে ফেব্রুয়ারিতে জনশক্তি রফতানি অনেকটা পড়ে যায়। মার্চে সেটি বেড়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রয়াসে কিছু উন্নতি ঘটায়।
গতকাল নয়া দিগন্তের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ইউরোপের দেশ ইতালি, রোমানিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার চাঙ্গা হয়ে উঠছে। গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে শ্রমিক পাঠানোর হার কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিক পাঠানোর হার এ খাতের মূল সমস্যা নয়। মূল সমস্যা হলো একেবারে অদক্ষ শ্রমিক পাঠানো। দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে না পারা। তার চেয়েও বড় বিষয়, বিদেশী নিয়োগদাতাদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। চিকিৎসক হিসেবে পাঠানো একজন বাংলাদেশী কর্মী হাসপাতালের ক্লিনার হওয়ার মতো যোগ্যও নন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বয়ং এক অনুষ্ঠানে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের কর্মকর্তার বরাতে এমন তথ্য দিয়ে সম্প্রতি নিজেই শরমিন্দা প্রকাশ করেন। বিষয়টি গুরুতর ও সত্যিকারের লজ্জার। জনশক্তি রফতানির সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ কেউ এ ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের কঠোর নজরদারির দরকার আছে। একই সাথে দরকার বিদেশে পাঠানোর আগে প্রতিটি কর্মীর দক্ষতার উন্নয়ন। এ জন্য অতীতের সরকারগুলো সারা দেশে অনেক প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। কিন্তু সেগুলো মোটেও কার্যকর নয়। প্রবাসী কর্মীদের প্রথম দরকার নিজের পেশাগত দক্ষতা। এরপর সবচেয়ে জরুরি, যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশের ভাষার ওপর দক্ষতা। আন্তর্জাতিক সংস্থা শ্রমিকদের জন্য খাতওয়ারি অনেক কারিকুলাম তৈরি করেছে। আমাদের ট্রেনিং সেন্টারে সেগুলো অনুসরণ করা হয় না। বিদেশী কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ শ্রমিক সরবরাহে এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় পুরোপুরি ব্যর্থ। কারণ রাজনৈতিক নেতাদের খেয়ালখুশিতে এগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কার্যকর ফল পাওয়ার দিকটি উপেক্ষিত থেকেছে। তা ছাড়া এসব বিষয়ে নিবিড় কোনো গবেষণা নেই, নজরদারিও নেই। কাজগুলো অবিলম্বে করা দরকার।
একই সাথে বিদ্যমান শ্রমবাজার ধরে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান জরুরি। মালয়েশিয়ার মতো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারেরও আমরা সুষ্ঠু পরিচর্যা করতে পারছি না। এটি করতে হবে। কেবল তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।