দীর্ঘ দিন থেকে বাংলাদেশে অনলাইনে জুয়া খেলা চলছে; কিন্তু এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না জুয়া খেলা। অনলাইন জুয়া এখন আর শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামাঞ্চলেও। তরুণ, যুবকসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ এই জুয়া খেলে নিঃস্ব হচ্ছে। জুয়া খেলায় অর্থ-সম্পদ হারিয়ে অনেকে মাদকাসক্ত হচ্ছে। কখনো আত্মহত্যা পর্যন্ত করছে। সরকারের প্রযুক্তিগত কঠোর পদক্ষেপ, নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে অনলাইনের জুয়া খেলা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

গতকাল নয়া দিগন্তে একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার আসক্তি সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া প্রতি ১০ জন ইন্টারনেট জুয়াড়ির মধ্যে একজন আসক্ত হয়ে পড়ছেন। প্রতি মাসে গড়ে একজন অনলাইন জুয়াড়ি পাঁচ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হারাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেটিং টিপস পেজের সংখ্যা ৫০০টির বেশি, যেগুলো তরুণদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করছে জুয়ায় নামতে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখের বেশি মানুষ বিভিন্ন অনলাইন জুয়া ও বেটিং সাইটের সাথে সরাসরি জড়িত। ২০২৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় দুই কোটির বেশি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২০-এর চেয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজার বেড়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অনলাইন জুয়ায় এ দেশ থেকে বছরে পাচার হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, অনলাইনে জুয়ার সাইটগুলো বন্ধ করা গেলেও জুয়ার অ্যাপ বন্ধ করা যায় না। মানুষ গুগল প্লে স্টোর থেকে জুয়ার অ্যাপ ডাউনলোড করে জুয়া খেলছে। এ ছাড়াও প্রতিদিন অনলাইনে জুয়ার নতুন নতুন ওয়েবসাইট আসছে। এভাবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা অনলাইন জুয়া বন্ধে একধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন অনুযায়ী অনলাইন জুয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। জুয়া বন্ধে এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ; কিন্তু অনলাইন জুয়া বন্ধে সরকারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশে কোনো জুয়ার ওয়েবসাইট খোলা রাখা যাবে না। এ জন্য বিটিআরসির সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। ভিপিএনের (ভয়েস ওভার প্রটোকল নেটওয়ার্ক) মাধ্যমেও যাতে এসব ওয়েবসাইটে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। গুগল প্লের সর্বনাশী জুয়ার অ্যাপগুলো বাংলাদেশে বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। জুয়ার বিজ্ঞাপনে অনলাইন সয়লাব। এসব অবৈধ বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হবে। জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে, যেকোনো মূল্যে তা বন্ধ করতে হবে।

সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধানে সামাজিক জাগরণ দরকার। আর সে জন্য সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। অনলাইন জুয়া খেলার মতো একটি নৈতিক অবক্ষয়জনিত অপরাধ বন্ধে পরিবারের পাশাপাশি ধর্মীয় নেতারাও ভূমিকা রাখতে পারেন। অনলাইন জুয়ার করালগ্রাস থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।