জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কিছুদিন পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নিয়ে উত্তেজনাকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। আলোচিত লন্ডন বৈঠকের পর তা প্রশমিত হলেও রাজনীতি এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। বরং পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়ানোর কারণ কী এবং কারা কী উদ্দেশ্যে এটা করছে তা নিয়ে রাজনৈতিক বোদ্ধা ও বিশ্লেষক মহলে চলছে নানা আলোচনা। একই সাথে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে কাদা ছোড়াছুড়ি ও পরস্পর আক্রমণের যে প্রবণতা চলছে তাতে রাজনীতিসচেতন সাধারণ মানুষ অস্বস্তিতে আছেন।

সাধারণ মানুষ চান দেশের রাজনীতি আবারো যেন স্বৈরাচারী ধারায় ফিরে না যায় এবং গণ-অভ্যুত্থান বেহাত না হয়। তাদের প্রত্যাশা জুলাই গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার যথাসময়ে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে একজন ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে। রাজধানীতে প্রকাশ্যে এমন একটি নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড যেকোনো বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করবে তা বলা বাহুল্য। আর এই ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ মনোভাবের প্রকাশ স্বাভাবিকভাবেই ঘটছে। এমতাবস্থায় বিক্ষুব্ধ ও অভিযুক্ত উভয়পক্ষের কাছেই সংযত ও যৌক্তিক আচরণ প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তেমনটি দেখা যায়নি। হত্যাকাণ্ডের পর উভয়পক্ষ থেকে এমন সব কুরুচিপূর্ণ স্লোগান ও গালমন্দ বেরিয়ে এসেছে, যা আকাক্সিক্ষত ছিল না। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে একটি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টাই যেন দেখা গেল।

একই সাথে এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, দেশের রাজনীতি এখনো পুরনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ছিল রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রবর্তন। অবস্থাদৃষ্টে স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের এতদিনকার সঙ্ঘাত ও বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে মুক্ত হয়ে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজ এখনো শুরুই করতে পারেনি।

সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠছে, মিটফোর্ড হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ-বিভাজন সৃষ্টি করে অভ্যুত্থানবিরোধী কোনো শক্তি কি ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে? যেখানে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে মাঠে সেনাবাহিনীও নিয়োজিত, সেখানে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কিভাবে ঘটতে পারে? এই হত্যার প্রতিক্রিয়ায় বর্তমান রাজনীতি, রাজনৈতিক দল ও দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে টার্গেট করে একটি মহল কিভাবে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিতে পারল!

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নানাবিধ সঙ্কট, সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা থাকেই। আর সেগুলো মেনে নিয়েই রাজনীতিবিদরা রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।

চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা দায়িত্বশীল আচরণ করবেন এটাই প্রত্যাশিত। এমন কোনো পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কারো জন্যই উচিত হবে না যাতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির মধ্যে দ্ব›দ্ব বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। সেই সাথে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে আরো সুসংহত করার মধ্য দিয়ে জনমনে রাজনীতি নিয়ে বিদ্যমান অস্বস্তির নিরসন করতে হবে।