বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এ জন্য বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট দায়ী থাকলেও দেশের পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রমও কম দায়ী নয়। এখন দেশের উষ্ণতা বৃদ্ধি লাঘবে গাছ লাগানো এবং তার পরিচর্যার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এই যখন অবস্থা, তখন কোনো কারণ ছাড়াই সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার (জামালগঞ্জ) সড়কের প্রায় চার হাজার গাছ কেটে সাবাড় করেছে বন বিভাগ।
নয়া দিগন্তে গত রোববার প্রকাশিত খবর থেকে জানা যাচ্ছে, প্রায় ২০ বছর আগে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার টুকের বাজার থেকে জামালগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়কের ১৯ কিলোমিটার এলাকায় প্রায় ২০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছিল। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতাধীন এসব গাছের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা বলে প্রায় তিন হাজার গাছ কাটার জন্য ২০২৪ সালে প্রথমার্ধে দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করে বন বিভাগ। গাছগুলোর বাকল কেটে লাল কালিতে নম্বর দিয়ে কাটার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা সেই সময়ে এর বিরুদ্ধে সড়কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তীব্র প্রতিবাদের মুখে বন বিভাগ গাছ কাটার সেই টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়, যার ফলে সাময়িকভাবে গাছগুলো রক্ষা পায়। চলতি বছর সেই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়।
আশার দিক হলো- সড়কের গাছ কাটার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে স্থানীয় জনতা রুখে দাঁড়িয়েছে। তারা সমাবেশ করে বন বিভাগের গাছ কাটার প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। গত জুন মাসে চট্টগ্রামে ডুলাহাজারা পার্কে গাছ লাগানোর মাধ্যমে সেই কার্যক্রমের উদ্বোধনও করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর গাছ লাগানোর এই কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। কিন্তু বন বিভাগের কী এমন হলো যে, প্রধানমন্ত্রী যখন নিজে গাছ লাগানোর ঘোষণা দেন, তখন তারা উল্টো গাছ কাটার কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ-সওজ বিভাগ জানিয়েছে, সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়কে বর্তমানে কোনো সম্প্রসারণ বা উন্নয়ন প্রকল্প চলমান নেই। এমতাবস্থায় উন্নয়নের কথা বলে বন বিভাগের এই গাছ কাটার সুযোগও নেই।
বন বিভাগ দেশের বনজ সম্পদের রক্ষক; কিন্তু বন রক্ষার নামে তাদের বিরুদ্ধে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার নজির রয়েছে। সারা দেশে নানা কৌশলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বন উজাড় করছেন। তাদের নীরবতায় এবং কখনো তাদেরই যোগসাজশে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। বন বিভাগের এ দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
সড়কের গাছ কাটার বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জের স্থানীয় জনতা চার দফা দাবি জানিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে- সড়কে চলমান সবধরনের গাছ কাটা বন্ধ করা, সামাজিক বনায়নের সুবিধাভোগীদের প্রাপ্য লভ্যাংশ যথাযথভাবে প্রদান, গাছ কাটার সাথে জড়িত বন বিভাগ, সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধভাবে গাছ বিক্রির পরিকল্পনা ও বৃক্ষনিধনে জড়িতদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেয়া। স্থানীয় জনতার এসব দাবি যুক্তিযুক্ত। দ্রুততার সাথে তাদের দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে।