বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে যেকোনো দেশের টেকসই উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও আমরা নিজেদের উপযোগী একটি বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে আমারা পেশাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে কাক্সিক্ষত সফলতা পাচ্ছি না। এ জন্য দেশে-বিদেশে বাংলাদেশীরা তেমন সম্মানজনক কাজ পাচ্ছেন না। যেমন- প্রবাসে আমাদের স্বজনরা কায়িক পরিশ্রম করে জীবিকা উপার্জন করছেন। অথচ প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে এখনো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের খাত। এ কথা বলা যায়, মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষায় দেশের নাগরিকদের শিক্ষিত করা গেলে আমাদের যে পরিমাণ লোক বিদেশে কর্মরত; তারা যে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, এর বহুগুণ অর্থ পাঠাতে পারতেন। অন্য দিকে দেশের বেসরকারি খাতে নিজেদের অদক্ষতায় বিদেশীরা কাজ করছেন; বিশেষ করে তৈরী পোশাক খাতে, তা-ও দূর করা যেত।

লক্ষণীয় হলো- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বহুধাবিভক্ত। নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে একটি একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে না পারার ব্যর্থতা বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা। বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য পাহাড়সম। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য সাদা চোখে ধরা পড়ে। যদিও দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের প্রভাব প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

বেসরকারি খাতে গড়ে ওঠা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি সংস্থা বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতে বিভিন্ন ধরনের ৯২ হাজার ৩৯২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলমান আছে। এর ম্যধ্যে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান ২৬ হাজার ১০৪টি। এমপিওভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠান ৬৬ হাজার ২৮৭টি, যা প্রায় ৭৪ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা অংশীদারত্ব মালিকানায় চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জাতীয় আয়ে (জিডিপি) অবদান উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

দেশের বেসরকারি নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে। শুধু তাই নয়, তাদের পেশাগত দক্ষতা অর্জনে সরকারের তরফ থেকে প্রশিক্ষণ দেয়ারও তেমন ব্যবস্থা নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলদের বেশির ভাগের মাস শেষে টানাটানি করে সংসার চালাতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে ইচ্ছা থাকলেও তারা পারেন না। তবে এ কথাও ঠিক, বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু লাভের আশায় খোলা হয়ে থাকে। সঙ্গতকারণে এ কথা বলা বেশি হবে না, শিক্ষায় অবদান রাখতে কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এসব শিক্ষালয়, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ শতভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাব্যয় আকাশছোঁয়া।

বাস্তবে দেশের যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারের বরাদ্দ আছে, সেগুলোও ঠিকমতো চলছে না। শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক-ছাত্রদের চ্যালেঞ্জ এত বেশি যে, তারা তা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলা খুব চ্যালেঞ্জিং। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে শিক্ষা খাতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে সরকারি বিনিয়োগ হতে হবে সুষম বণ্টনের মাধ্যমে।

শিক্ষাবিদদের মতো আমরাও মনে করি, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আয়মুখী হওয়া উচিত নয়, হওয়া উচিত জ্ঞানভিত্তিক। শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-দক্ষতা অর্জন করে যে যেখানে যোগ্য, সেখানে যাবেন- এটিই শিক্ষার সারকথা। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জীবনের চাহিদা যুগোপযোগী করার পাশাপাশি তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সরকারকে তদারকি বাড়াতে হবে।