বিগত সাড়ে ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দুঃশাসনে জাতি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দল-মত-পথের লোকজনকে গুম-খুন আর নির্যাতন করে ক্ষমতা ধরে রাখতে অপচেষ্টা চালায়। তবে সব স্বৈরশাসকের মতো শেখ হাসিনারও শেষ রক্ষা হয়নি। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে চব্বিশের ৫ আগস্ট তাকে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে। সেখান থেকে এখনো দেশবিরোধী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকারের প্রতি দেশবাসীর প্রত্যাশা এখনো আকাশছোঁয়া। এর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার এবং দেশে গণতান্ত্রিক ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একটি অর্থবহ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা। এ লক্ষ্য নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যে জাতিকে ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তার কিছু চিহ্ন স্পষ্ট। বিশেষ করে জাতীয় অর্থনীতি খাদের কিনার থেকে তুলে আনতে খানিকটা সফল হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার চেষ্টাও আগের তুলনায় ভালো। কিন্তু সংস্কার এবং নির্বাচন নিয়ে সরকার ও কিছু রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কয়েকটি দলের চাওয়া, দ্রুত প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কার করে সরকার যেন জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে।

সংস্কার আগে, না নির্বাচন আগে- এ নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে। এমন প্রেক্ষাপটে আর ক’দিন পর ‘৩৬ জুলাই’য়ের প্রথম বার্ষিকী। ইতোমধ্যে বিপুল সম্ভাবনায় মোড়ানো ইতিহাসের সুন্দরতম ১০টি মাস ব্যয় করেছি আমরা। এখনো স্বজন হারানোদের চোখের পানি ও শোক না থামলেও মাঠে-ঘাটে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক বিবাদ স্পষ্ট। এই বিবাদ সরলরৈখিক নয়, রীতিমতো বহুমুখী ও বিচিত্র।

ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে এই যে বিবাদ; তা শুধু রাজনীতির ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই। আর্থ-সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও একে-অপরের সম্পর্কে চির ধরিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো পরস্পরের দিকে কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনে সম্ভাব্য এই বৈঠক আজ শুক্রবার অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। দেশবাসী এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে এই বৈঠকের ফল কী হয় তার দিকে।

সবার মতো আমাদেরও প্রত্যাশা, চব্বিশের সফল গণ-অভ্যুত্থানে বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোয় নিবর্তনমূলক যে ব্যবস্থা রয়েছে; তা দূর করে একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার যে অপার সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে তাকে শতভাগ কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য শুধু একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আঞ্জাম দেয়াই নয়, সংস্কারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গত কারণে এ কথা বলা যায়, নির্বাচন ও সংস্কার কোনোটিকে কম গুরুত্ব দেয়ার উপায় নেই। এ দুইয়ের ভারসাম্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জাতীয় কল্যাণ। এটি আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।

আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মধ্যে অনুষ্ঠেয় আজকের বৈঠকে জাতি সেই দিকনির্দেশনা পাবে।