দেশে জরুরি অবস্থা জারির প্রক্রিয়া সংশোধন করা হচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে আলোচনায় এ বিষয়ে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। সংবিধানে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে জরুরি অবস্থা জারি হবে। এখন তা সংশোধন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদনে জরুরি অবস্থা জারি হবে। এর সাথে আরেকটি বড় সংস্কার আসছে। সেটি হলো, জরুরি অবস্থা জারিসংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা উপস্থিত থাকবেন।

সত্য যে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। পুলিশ বাহিনী এখনো পুরোপুরি সংগঠিত নয়। জনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছে সশস্ত্রবাহিনী; কিন্তু পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলা যাচ্ছে না।

ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বলা হয়েছে, জরুরি অবস্থা যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না হয়, সে লক্ষ্যে নতুন বিধান সংযোজনের বিষয়ে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু সত্য এটাই যে, আমাদের দেশে এ যাবৎ অন্তত পাঁচবার জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে এবং এর পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কারণ ছিল না। ১৯৭২-এর সংবিধানে জরুরি অবস্থা জারির বিধান ছিল না। স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী দুঃশাসন ও বেপরোয়া লুটপাট, সন্ত্রাসের প্রেক্ষাপটে সরকার সংবিধানে জরুরি অবস্থা জারির বিধান সংযোজন ও জরুরি অবস্থা জারি করে। সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতির কাছে যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, দেশে এমন জরুরি অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে, যাতে যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে বাংলাদেশ বা এর যেকোনো অংশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপদের মুখোমুখি, তাহলে তিনি অনধিক ১২০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন। এই ১২০ দিনের বিধানও কমিয়ে ৯০ দিন করা হচ্ছে।

স্বৈরাচারের নৈরাজ্যকর শাসন থেকে হাজারো প্রাণের বিনিময়ে মুক্ত জাতি একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার দিকে যাচ্ছে। জাতির প্রত্যাশা, বাংলাদেশ হবে এমন একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ দেশ যেখানে সবাই গণতান্ত্রিক পরিবেশে সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যেতে পারবে। শুভ বোধসম্পন্ন সবার চাওয়া, দেশে যেন জরুরি অবস্থা জারির মতো কোনো পরিবেশের কখনো উদ্ভব হবে না।

ফ্যাসিবাদী সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ধ্বংস করা রাজনৈতিক পদ্ধতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রাসঙ্গিকতা এখানে। এখানে রাজনৈতিক দলের সাথে ঐকমত্য কমিশনের সংলাপের গুরুত্ব। আলোচনায় যেসব বিষয় উঠে আসছে তার মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে দলগুলো সম্মত হতে পেরেছে। তবে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হতে পারেনি।

জনগণ আশা করে, ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক দলগুলো একমাত্র জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে, যাতে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে একটি মর্যাদাসম্পন্ন স্বাধীন-সার্বভৌম ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। সব দলের ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। জাতীয় প্রশ্নে অন্যের যুক্তি মেনে নেয়ার মধ্যে কোনো অসম্মান নেই; বরং এতে স্বদেশপ্রেম ও মহত্ত্বের প্রকাশ ঘটে।