গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ সংবিধান অনুযায়ী নিজ নিজ কর্ম সম্পাদন করলে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। কিন্তু যে রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল, সেখানে এ তিন বিভাগ ঠিকভাবে কাজ করে না। এর মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগ না থাকলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও ভিন্নমত দমন সরকারের জন্য সহজ হয়।

শেখ হাসিনার শাসনামলে সাড়ে ১৫ বছরে আমরা তাই দেখেছি। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পরিপূর্ণভাবে পৃথক থাকলে হয়তো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা না-ও হতে পারতাম। বিচার বিভাগ পৃথক ও স্বাধীন থাকলে নাগরিক অধিকার রক্ষায় আদালত পাশে দাঁড়াতে পারতেন।

আমাদের রাষ্ট্রের এই গভীর সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ নিয়ে দু’টি অধ্যাদেশ জারি করে। এগুলো হলো- সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দু’টি অধ্যাদেশই জাতীয় সংসদে পাস না করায় এখন বিচার বিভাগ আবার নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী ও আইন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা রাখার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু সাংবিধানিক বিধান থাকলেও ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কোনো সরকার এ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়নি। ‘মাসদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯৯৯ সালে ১২টি নির্দেশনা দিয়ে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার জন্য ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন; কিন্তু সেই রায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার দু’টি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। বিএনপি সরকার অধ্যাদেশ দু’টি সংসদের মাধ্যমে আইনে পরিণত না করায় তা বাতিল হয়ে যায়।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে পাস না হওয়ায় বিচার বিভাগ আবার প্রশাসনের ‘পকেটে চলে যাবে’ বলে মনে করেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। গত মঙ্গলবার সুজনের গোলটেবিলে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এমন শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, নিজেদের ‘পছন্দমতো’ বিচারক নিয়োগ দিতে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে দৈনিক নয়া দিগন্তে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেছেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে বাস্তব চিত্র হচ্ছে হাসিনার আমলে যা ছিল, এখনো তাই থাকল। বিচার বিভাগ নিয়ে দুটো আইন আছে- একটি হচ্ছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট অব জাজেস, আরেকটি সচিবালয়। সচিবালয় স্থাপনের বিষয়ে কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছিল না। তারপরও সচিবালয় বাতিল করা হলো। এটি স্থাপনের পর সক্রিয় হয়ে উঠেছিল, লোকবল নিয়োগ হয়েছে। জুডিশিয়ারি সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনতে সচিবালয় স্থাপন করা হয়েছিল। বাতিল করায় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে গেল।

বিশেষজ্ঞদের মতো আমাদেরও শঙ্কা, এই অধ্যাদেশ দু’টি আইনে পরিণত না করার পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য আর কিছু নয়- অতীতে যেমন নিজেদের পছন্দমতো বিচারক নিয়োগ দেয়ার অবারিত সুযোগ ছিল, তা বহাল রাখা। যাতে বিচার বিভাগের মাধ্যমে রাজনৈতিক ইচ্ছা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায়। যেমন- হাসিনা সরকার পছন্দমতো বিচারের রায় আদায় করে নিয়েছিল। অথচ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বাধীন বিচার বিভাগ অপরিহার্য।