পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ এখন ঢাকায়। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা। পরে আমনা বালুচ প্রধান উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে সৌজন্যমূলক দেখা করবেন। মূলত তিনি এসেছেন চলতি মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর চূড়ান্ত করতে। প্রায় ১৫ বছর পর দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ের এ বৈঠক হচ্ছে। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর হবে প্রায় ১৩ বছর পর।

ঢাকা-ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্কের এই যোজন যোজন দূরত্বের কারণ স্পষ্ট। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নকে রাজনৈতিক স্বার্থে বড় করে দেখিয়ে তা জিইয়ে রাখা হয়। যদিও পৃথিবীর কোনো দেশ-ই সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির সাথে বৈরিতা চিরকাল পুষে রাখে না। কিন্তু পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটে। মাঝখানে হিমালয়ের মতো উঁচু হয়ে উঠেছিল ভারতের আধিপত্যের দেয়াল। গত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী এ দেশকে ভারতের সঙ্গে কার্যত একাকার করে ফেলেছিল। সেই সূত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হয়ে উঠেছিল নিছক দিল্লির বিদেশনীতির সম্প্রসারণ। পাকিস্তানকে বৈরী দেশ হিসেবে দেখার সেটিই কারণ। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে পুরনো শত্রুতা ধরে রাখা কাজের কথা নয়। এখন আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রধান নিয়ামক অর্থনৈতিক লেনদেন তথা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহায়তা। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান রাজনৈতিক বা অন্য কোনো জটিলতা জিইয়ে রাখা উচিত নয়, যা অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারতের ভূমিকা সামান্য বললে পুরোটা বলা হয় না। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের উন্নয়ন নয়, এ দেশকে সব দিক থেকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল রাখাই ছিল কথিত বন্ধু রাষ্ট্রটির একমাত্র লক্ষ্য। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতিসহ সব বিষয়ে স্বাধীনভাবে নীতিনির্ধারণের চেষ্টা করছে। অর্থনীতির সব সম্ভাবনা উদ্ঘাটন ও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ আয়োজন। কিন্তু ভারতের সেভেন সিস্টার্সের অর্থনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টার একটি মন্তব্য ঘিরে ভারতের যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল; তা আঞ্চলিক অগ্রগতির আকাক্সক্ষার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আমরা শুধু পাকিস্তান নয়, ভারত, চীন, নেপাল, ভুটানসহ এ অঞ্চলের সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক চাই, পারস্পরিক বিকাশের পথে এগিয়ে যেতে চাই। সে জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রথমে সার্কের উজ্জীবনের কথা বলেছেন। এটিই এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি। যেমনটি বৈশ্বিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মুসলিম দেশগুলো আমাদের উন্নয়ন অংশীদার।

পাকিস্তানের সাথে আমাদের ব্যবসায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ আছে, যা এতদিন কাজে লাগানো যায়নি। এখন তা কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক নিরাপত্তার মতো অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও অন্যতম হুমকি ভারত। বর্তমান ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানসহ যেকোনো দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ চরম সত্য সামনে রাখতে হবে।

একই সাথে ভারতকেও বাংলাদেশ ও সমসাময়িক বিশ্বের বাস্তবতা বুঝতে হবে। ছড়ি ঘোরানোর প্রবণতা ছেড়ে সহযোগিতার হাত বাড়ানোতেই সবার মঙ্গল।