দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ক্ষুদ্র শিল্পের (এসএমই) অবদান বিশাল। বলা হয়, ক্ষুদ্র শিল্পই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কারণ এই খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং শিল্পে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্যবিমোচনে এ খাতের অবদান অপরিসীম। প্রায় আট লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে, যা দেশের ৮৭ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।

দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ১০ থেকে ৩০ জন মানুষকে সরাসরি চাকরি দেয়। স্থানীয় ব্যবসায়, কাঁচামাল সরবরাহকারী ও পরিবহন খাতসহ পরোক্ষভাবে আরো কয়েকগুণ মানুষ এই খাতের সাথে যুক্ত থাকে।

প্রতি বছর অন্তত ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় এদের বড় অংশ বেকারত্বের অভিশাপে ভোগে। এই জনশক্তিকে সামান্য ঋণ দিয়ে খুব সহজেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তায় পরিণত করা সম্ভব। তাহলে বেকারত্বের চাপ কমার পাশাপাশি অর্থনীতিও জোরদার হবে। অর্থাৎ— ক্ষুদ্র শিল্প হতে পারে আত্মকর্মসংস্থানের অনেক বড় একটি সুযোগ। নীতিনির্ধারকরা এসব বিষয়ে সবসময়ই ইতিবাচক কথা বলেন; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মূলধনের অভাব। বিশেষ করে সারা দেশের গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রায়ই যথাযথ কাগজপত্র থাকে না। ফলে ব্যাংক ঋণ পাওয়া সম্ভব হয় না। যাদের কাগজপত্র আছে তারাও অবহেলার শিকার হন। কারণ সরকারি সুবিধার বেশির ভাগ দখল করেন মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তারা। ২০২০ সালের কোভিড মহামারীর পর এমন প্রবণতা দেখা গেছে। কোভিডের ক্ষতি সামলে ওঠার জন্য সরকার যে প্রণোদনা দেয় তা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পাননি। সবটাই গেছে বড় ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের পকেটে।

এমন বঞ্চনার উদাহরণ আরো আছে। এমনকি বড় উদ্যোক্তারা ব্যবসায়িক নীতির মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পথে বসানোর ব্যবস্থা করেন। বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ যখন চানাচুর, চিপস, ডালবুট কিংবা চিঁড়াভাজার মিনি প্যাক বাজারে ছাড়ে, তখন এসব পণ্যের উৎপাদনকারী খুদে উদ্যোক্তারা পথে বসতে বাধ্য। বড় নামী কোম্পানির পণ্য বাদ দিয়ে ছোট প্রতিষ্ঠানের পণ্য কেউ কিতে চাইবে না। খুদে উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত।

একসময় ঢাকার কেরানীগঞ্জ বা ধোলাই খালের প্রকৌশল শিল্প নিয়ে সরকারি মহলে বেশ আগ্রহ দেখা যেত। সে আগ্রহ এখন আর নেই। অথচ কেরানীগঞ্জের তৈরি ইলেকট্র্রনিক পণ্যে বিদেশী কোম্পানির স্টিকার লাগিয়ে দেদার বিপণন হচ্ছে, রফতানিও হচ্ছে। এসব উদ্যোক্তা যাতে স্বনামে বাজারে পণ্য আনতে উৎসাহিত হন, এমন ব্যবস্থা করা জরুরি। কারণ এদের পণ্যের মান মোটেও খারাপ নয়।

অথচ ক্ষুদ্রশিল্প খাত বর্তমানে সঙ্কটের মুখে। ডলারের উচ্চমূল্য, ক্রমবর্ধমান সুদহার, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলার অনিশ্চয়তা এবং বিদেশী পণ্যের চাপে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা টিকতে পারছেন না। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসায় গুটিয়ে নিচ্ছেন। এ অবস্থা কাঙ্ক্ষিত নয়।

দেশ ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে ক্ষুদ্রশিল্প বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ জন্য দক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ, সুদমুক্ত সহজ কিস্তিতে ঋণ দেয়া, বিএসটিআই-সহ সব প্রতিষ্ঠানের সেবা সহজলভ্য করা এবং সহজ ভ্যাট ও ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা করা জরুরি।