সারা দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। বজ্রপাতে মৃতদের বেশির ভাগই কৃষক, যারা খোলা মাঠে কাজ করেন।
গত শনিবার সারা দেশে বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জনই কৃষক। চলতি বছর এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে এ বছরের গত শনিবার পর্যন্ত ১৫ বছরে বজ্রপাতে চার হাজার ৩৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে।
দেশে প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। আর হাওর অঞ্চলগুলো বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এসব অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনা। এ ছাড়াও ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এলাকায় বজ্রপাত বেড়ে গেছে বলে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর একটি কারণ হতে পারে বড় বা উঁচু গাছের অভাব। শহরে ঘরবাড়ি বেশি হলেও সেখানে বজ্রনিরোধক থাকায় বজ্রপাতে কোনো ক্ষতি হয় না; কিন্তু গ্রামাঞ্চলে একসময় বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত বড় ও উঁচু গাছ; কিন্তু এখন উঁচু গাছ কমে গেছে। প্রায় নেই বললেই চলে। তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওফিজিক্স বিভাগের গবেষক কলিন প্রাইস তার এক গবেষণায় বলেছেন, বায়ুদূষণ তথা পরিবেশদূষণের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বজ্রপাতের। বজ্রপাতে এক দিকে যেমন বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ছে, তেমনি বায়ুদূষণের ফলে বেড়েছে পরিবেশে বজ্রপাতের হার ও তীব্রতা।
২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার; কিন্তু এই দুর্যোগ মোকাবেলায় যে ধরনের প্রস্তুতি থাকার কথা ছিল তা নেই বললেই চলে। ফলে মৃত্যুর হার কমছে না। বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে তালগাছ বেশ উপকারী। আওয়ামী লীগ সরকার ৪০ লাখ তালগাছ লাগানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। সে প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে। বজ্রপাত ঠেকাতে স্বল্প পরিসরে লাইটনিং অ্যারেস্টার লাগানো হয়েছিল। সেগুলোও তেমন কার্যকর হয়নি।
জীবন যেমন অমূল্য তেমনি তা রক্ষার দায় রয়েছে। জীবনকে অপমৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার সুযোগ নেই। বজ্রপাতে মৃত্যুকে অনেকটা অবহেলা, অসচেতনতা কিংবা আত্মরক্ষার উপকরণের অভাবজনিত বলা যায়। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বজ্রপাতে মৃত্যু অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে কৃষক কিংবা ভুক্তভোগীদের যেমন করণীয় রয়েছে তেমনি সরকারেরও দায়িত্ব আছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তালগাছ লাগাতে হবে এবং সেগুলো বড় হওয়া পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এখনো যেসব বড় গাছ আছে সেগুলো রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। গাছ কাটা নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। হাওর অঞ্চলের মাঠে কৃষক যাতে বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা পেতে পারেন সে জন্য ছাউনি তৈরি করা যায়। সবচেয়ে জরুরি হলো সচেতনতা। বজ্রপাতের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক হারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে করে বজ্রপাত হওয়ার লক্ষণ দেখেই কৃষক কিংবা অন্য কেউ নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে সুরক্ষা পেতে পারেন।