সুশাসন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবে আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত সবলের হাতে দুর্বল জনগোষ্ঠী সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা। দুঃখজনক হলেও সত্য, দাম্পত্যজীবন শুরুর পর থেকে স্বামীর হাতে বেশি নির্যাতিত হচ্ছেন দেশের বেশির ভাগ নারী। নারীদের অন্য কারো চেয়ে স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা তিনগুণ বেশি।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে গত বৃহস্পতিবার যৌথভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসঙ্ঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০২৪-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে।

সারা দেশে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত জরিপ বলছে, বাংলাদেশে জীবনে অন্তত একবার ৭৬ শতাংশ নারী এবং গত ১২ মাসে ৪৯ শতাংশ নারী জীবনসঙ্গী বা স্বামীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সহিংসতার মাত্রা বেশি হলেও প্রায় ৬৪ শতাংশ ভুক্তভোগী এই কথা কাউকে কখনো বলেননি। জরিপের তথ্য বলছে, সহিংসতার ঝুঁকির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তারতম্য যেমন দুর্যোগপ্রবণ এলাকার নারীরা তাদের জীবদ্দশায় এবং বিগত ১২ মাসের মধ্যে অদুর্যোগপ্রবণ এলাকার নারীদের তুলনায় জীবনসঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা বেশি মাত্রায় সহিংসতার সম্মুখীন হন। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সুনাম রক্ষা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ এবং এ ধরনের সহিংসতা স্বাভাবিক বলে মনে করার প্রবণতাসহ বিভিন্ন কারণে মূলত তারা নীরব থাকেন।

লক্ষণীয় হলো নারী সহিংসতা বাংলাদেশে এতটা প্রকট যে প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। ৪১ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে গত ১২ মাসে এ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব পরিসংখ্যান জাতিসঙ্ঘের মানসম্পন্ন পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতার বিস্তার পর্যবেক্ষণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে প্রাসঙ্গিক এমন সহিংসতামূলক আচরণ অন্তর্ভুক্ত করলে এই সহিংসতার ব্যাপকতা আরো বেশি।

বিবিএসের জরিপের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ ও মানসিক সহিংসতা সর্বাধিক সংঘটিত সহিংসতার ধরন হিসেবে পাওয়া গেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। অথচ আমাদের দেশ মুসলিমপ্রধান হওয়ায় এ ধরনের মানসিকতার উপস্থিতি অনুল্লেøখযোগ্য হওয়ার কথা। পবিত্র কুরআনের তৃতীয় নম্বর সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘তোমরা একে-অপরকে প্রভু বানিয়ো না।’ দেশে অন্ততপক্ষে মুসলমানরা এই আয়াতের পরিপালন করলে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা খুব কম হওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না; মূলত পুরুষের কর্তৃত্ববাদী আচরণ সমাজে তীব্রভাবে হাজির থাকায়। নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান বুঝিয়ে না দেয়াও এর জন্য দায়ী।

সঙ্গত কারণে এ কথা বলা যায়, যেকোনো নারী-পুরুষ দাম্পত্যজীবনের শুরুতেই যদি একে-অপরের প্রতি সম্মানবোধ বজায় রেখে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, তা হলে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে পুরুষের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে।