নিত্যপণ্যের দাম চড়া, বাজারে আগুন- সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই এমন শিরোনাম দেখা যায়। এ নিয়ে সম্পাদকীয়ও লেখা হয়। আলোচনা-সমালোচনা হয়, বাজার স্থিতিশীল কীভাবে রাখা যায়, বাতলে দেয়া হয় সেসব কৌশলও। কিন্তু বাজারে স্থিতি আসে না। বাড়তি দামের সাথে ভোক্তাদেরকেই মানিয়ে নিতে হয়। মানিয়ে নিতে না নিতেই নতুন করে আরো বাড়তি দাম চেপে বসে তাদের ঘাড়ে।
কাঁচাবাজারে নতুন করে ‘আগুন’ লেগেছে বলে গতকাল শিরোনাম করেছে সংবাদমাধ্যমগুলো। মাছ, ডিম ও মুরগির দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া মাছ ছিল সীমিত আয়ের মানুষের আমিষের উৎস। কিন্তু এগুলোর দামও এখন কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা ছুঁয়েছে। টানা বৃষ্টির প্রভাবে সবজি সরবরাহেও ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। এক কেজি বেগুন কেনা সাধারণের জন্য বিলাসে পরিণত হয়েছে। তবে আমদানি করার পর কাঁচামরিচে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। বিক্রেতারা অজুহাত দিচ্ছেন ‘বৃষ্টি’ ও ‘সরবরাহ সঙ্কটে’র। এটা সত্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফসলের ক্ষতি হয়। পরিবহনে সমস্যা হয়। কিন্তু এতে পণ্যের দাম দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যেতে পারে না।
কোনো একটি নির্দিষ্ট পণ্যের দাম বাড়লে ক্রেতারা বিকল্প খাবার বেছে নেয়ার সুযোগ পান। কিন্তু যখন মাছ, গোশত, ডিম ও সবজির মতো প্রায় প্রতিটি মৌলিক খাদ্যসামগ্রীর দাম একসাথে বেড়ে যায়, তখন বিকল্প বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে না। সীমিত আয়ের মানুষের ‘খেয়ে’ বেঁচে থাকার পথই বন্ধ হয়ে যায়।
নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সে তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না। প্রতি মাসে খাবারের পেছনে মূল ব্যয়ের বড় অংশ চলে যায়। তখন চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য জরুরি খরচ কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়। এতে মানসিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়। যারা দেশ চালান, তারাও এই বিষয়গুলো বোঝেন। কিন্তু তারপরও কেন সমাধান আসে না?
এই সঙ্কটের সমাধান যে খুব সহজেই করে ফেলা যায় বা যাবে, সেটা নয়। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ইতিবাচক মনোভাব থাকলে নিত্যপণ্যের দামের লাগাম টানা অসম্ভবও নয়। দেখা যায় বাজারে যখন ‘আগুন’ লাগে, তখন জরুরিভিত্তিতে ‘অগ্নিনির্বাপণ’-এর ব্যবস্থা করা হয়। ‘আগুন’ কোনোরকম নিয়ন্ত্রণে আনার পর সেটা নিয়ে সব চেষ্টা ও প্রক্রিয়া থেমে যায়। যারা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেন, তাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হয় না।
আমরা মনে করি, বাজারে স্থিতি আনতে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সমন্বয়ভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া উচিত। পাইকারি ও খুচরা বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি বা অতিরিক্ত মুনাফা লোটার অপচেষ্টা বন্ধে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত ও সারপ্রাইজ অভিযান চালাতে হবে।
উৎপাদক বা কৃষক থেকে সরাসরি খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সরকারি বিপণন ব্যবস্থা সুসংগঠিত করা জরুরি। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা অন্যায্য লাভ করতে পারবে না।
দেশীয় বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকলে সেটা দ্রুত সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করতে হবে। বাজারে স্থিতি আনতে ডিম, মুরগি বা অন্যান্য নিত্যপণ্য সময়মতো আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অবিলম্বে কার্যকর বাজার মনিটরিং করা হোক। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর পেছনে যে সিন্ডিকেট কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা হোক।