দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নাগরিক-জীবনে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই আধুনিক রাষ্ট্রে অর্থব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুষ্ঠুভাবে অর্থব্যবস্থাপনায় প্রতিটি দেশ ফি বছর আয়-ব্যয়ের বাজেট প্রণয়ন করে। বাজেটের লক্ষ্য থাকে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। তবে যে দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য যত কম; সে দেশের সামষ্টিক সম্পর্ক তত দৃঢ় ও মজবুত। বৈষম্যহীন মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একাত্তরে আমরা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু আজো কাক্সিক্ষত বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো বিগত ১৫ বছর পতিত স্বৈরাচারের অপশাসনে বৈষম্য আরো তীব্রতর হয়েছে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ফসল অন্তর্বর্তী সরকার গত সোমবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে। তবে ঘোষিত বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য কতটুকু স্বস্তি বয়ে আনে সেটিই দেখার বিষয়।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থউপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, আগামীতে কমে আসবে মূল্যস্ফীতি, বাড়বে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর-জিডিপির অনুপাত, এমনকি বেসরকারি বিনিয়োগও। কর্মসংস্থানও বাড়বে। রাজস্ব আদায়ে বড় অগ্রগতি হবে। এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা।

তার এ আশাবাদ বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কৌশলের ঘাটতি দেখা গেছে। এমনকি বাজেট বক্তৃতায় তথ্য-উপাত্তেরও ঘাটতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। যেমন- বিগত বাজেট বক্তৃতায় দেখায় সেখানে জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর-জিডিপির অনুপাতের একটি প্রক্ষেপণ ছিল। কিন্তু এবারের বাজেটে তা অনুপস্থিত। এগুলো খুঁজে বের করতে হলে যেতে হবে মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিবৃতিতে। এখানে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৫ শতাংশ হবে বলে বলা হয়েছে। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধি কিভাবে অর্জন হবে তার কোনো কৌশলও সেভাবে বলা হয়নি। এমনকি এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে দেশে কী পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে তারও কোনো তথ্য-উপাত্ত বাজেট বক্তৃতায় পাওয়া যায়নি।

একই অবস্থা মূল্যস্ফীতির বেলায়। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর। এটিকে আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এটি অর্জন করতে হলে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হবে এর উল্লেখ নেই। তবু বলা হয়েছে, মধ্যমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে। সেই সাথে কমবে মূল্যস্ফীতি। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘জুন মাসেই পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের কোটায় নেমে আসবে। মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফলে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে। তবে আগামী অর্থবছরে বাড়বে এবং মধ্যমেয়াদে সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আমরা আশা করছি।’

বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। বরাদ্দ দেয়া হয়েছে জুলাই যোদ্ধাদের জন্য। অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিতে এবারের বাজেটে সুবিধাভোগীর সংখ্যা এবং মাথাপিছু বরাদ্দ- দুই-ই বাড়ানো হয়েছে।

বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের উৎসে কর কমিয়ে অর্ধেক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবেন। যেহেতু বাজেট প্রণয়নে প্রবৃদ্ধি নয়, সামগ্রিক উন্নয়নে নজর দেয়া হয়েছে। গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বৈষম্যহীন দেশ গড়ায়। এসব আশাবাদ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল নিয়ে এগোবে এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।