পতিত স্বৈরাচার দেশের শিল্প-ব্যবসায়-বাণিজ্যের পুরোটাই খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। এখন অর্থনীতির পুনরুদ্ধার করতে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। আট মাসে দেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করছে। তার পরও সরকারের কিছু পদক্ষেপ ব্যবসায়ী মহলে হতাশার জন্ম দিচ্ছে।
গত রোববার এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ৩৩ শতাংশ। পাশাপাশি পুরনো শিল্পকারখানায় অনুমোদিত লোডের বাইরে অতিরিক্ত ব্যবহারে গ্যাসের বাড়তি দাম আরোপ হবে। এই দাম বাড়ানোয় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। সেই সাথে নতুন ও পুরনো উদ্যোক্তাদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। আগের চেয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ অনুকূল হলেও অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত গতি ফেরেনি।
গ্যাসের দাম নির্ধারণের এ প্রক্রিয়া শিল্পে বৈষম্য তৈরি করবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, একই খাতে ব্যবসারত পুরনো কারখানা কম দামে গ্যাস পাবে। নতুন কারখানাকে বাড়তি দাম দিতে হবে। ফলে পুরনোদের সাথে নতুনেরা প্রতিযোগিতায় বিপাকে পড়বে।
বাংলাদেশে জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সব সময় কম ছিল। উদ্বেগের বিষয় হলো, হারটি কয়েক বছর ধরে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ছিল ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশে নেমেছে। শুধু দেশী বিনিয়োগ নয়, বিদেশী বিনিয়োগও কাক্সিক্ষত নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্ত, চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) প্রথম ছয় মাসে মাত্র ২১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
সার্বিকভাবে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি ব্যাংকঋণ, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ইত্যাদি দেখে বোঝা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি গত ফেব্রুয়ারিতে ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ২৫ শতাংশের মতো। শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণও কমছে। বাস্তবতা হলো, বিনিয়োগ যথেষ্ট হারে না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান কমে যায়। মানুষের আয়-রোজগারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গ্যাসের দাম নির্ধারণের পদ্ধতি কতটুকু যৌক্তিক সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমদানি ও সরবরাহকারী পর্যায়ে দুই দফায় ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর), পরিচালন খরচ, উন্নয়ন খরচ যুক্ত করে দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু গ্যাস চুরি ঠেকাতে পারছে না সরকার। বারবার দাম বাড়িয়ে তা সমন্বয় করছে। গ্যাস কোম্পানির অদক্ষতার কুফল পড়ছে ব্যবসায়ীদের ওপর। লক্ষণীয়, এখন গ্যাসের কারিগরি ক্ষতির হার প্রায় ৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মান অনুসারে, কারিগরি ক্ষতি শূন্য দশমিক ২০ থেকে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ গ্রহণযোগ্য। বিইআরসির তথ্য, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কারিগরি ক্ষতির নামে গ্যাসের অপচয় হয়েছে ১০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার।
যখন-তখন গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে কারিগরি ক্ষতি কমিয়ে আনা উচিত। সেই সাথে নতুন ধার্যকৃত দাম পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে সরকারকে যাতে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহে ভাটা না পড়ে।