ঢাকা শহরে একসময় অসংখ্য খাল-জলাধার ছিল। প্রাকৃতিক এসব জলাধার শুধু শহরের সৌন্দর্য বাড়াত না; বরং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনে জলাবদ্ধতা কমাত। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করত। কিন্তু গত কয়েক দশকে নগরায়নের চাপ, পরিকল্পনার অভাব ও দখলদারিত্বে ঢাকার বেশির ভাগ খাল ও জলাধার ভরাট বা সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। ফলে ঢাকা এক নীরব পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে।

রাজধানীর জলাধার ও খালের ৫০ শতাংশের বেশি এখন বিলীন। বাকিগুলো অস্তিত্ব সঙ্কটে। খাল ও জলাধার দখলের নেপথ্যে আছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ভূমিদস্যু, অসাধু ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ক্ষমতাবানরা। তাদের ছত্রছায়ায় সরকারি ও বেসরকারি জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, বস্তি, মার্কেট ও নানা স্থাপনা। এতে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। খাল, জলাধার ও নিম্নাঞ্চল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না। সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক। ভারী বৃষ্টি হলে নগরজীবনে নেমে আসে চরম জনদুর্ভোগ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) গবেষণা মতে, স্বাধীনতার পর ঢাকায় ৫৭টি খাল ছিল। কিন্তু নগরায়ন, দখল ও ভরাটে বর্তমানে এই সংখ্যা ২৬টি। এগুলোর বেশির ভাগের অবস্থা নাজুক। এতে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতে ঢাকার অনেক এলাকায় মারাত্মক জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

খাল ভরাটের প্রভাব শুধু জলাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি শহরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। খালগুলো ছিল শহরের শ্বাসনালী, যেখানে পানি প্রবাহিত হয়ে দূষণ কমাতে সাহায্য করত। কিন্তু এখন সেই জায়গায় জমে থাকা ময়লা ও স্থির পানি নানা ধরনের রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জলাধার কমে যাওয়ায় নগরে তাপমাত্রাও বাড়ছে, যা শহরে নতুন পরিবেশগত সঙ্কট তৈরি করছে।

ঢাকার এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী দখলদারদের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুর্বল নগর পরিকল্পনা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব। খাল রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন সীমিত। গত এক যুগের বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বিভিন্ন প্রকল্পে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। কিন্তু নগরবাসীর দুর্ভোগ কমেনি; বরং প্রতি বর্ষায় একই চিত্র ফিরে আসে, পানি জমে থাকে সড়ক, বাসাবাড়ি ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে।

ঢাকার টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য খালগুলো পুনরুদ্ধার অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় জলাধার ও খালের গুরুত্ব অগ্রাধিকার দেয়া। তৃতীয়ত, নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো; যাতে মানুষ নিজেরা এসব জলাধার সংরক্ষণে এগিয়ে আসেন। কারণ একটি শহর শুধু উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়ক দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর। যদি ঢাকার খালগুলো রক্ষা করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে এ শহরের বাসযোগ্যতা আরো হুমকিতে পড়বে। তাই কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।