মানুষ অভিবাসী হয় কখনো উন্নত জীবনের আশায়, আবার কখনো বাধ্য হয়ে। অভিবাসী হওয়াটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এটি যখন অবৈধ পথে সম্পন্ন হয়, বিপত্তি বাধে তখন। অবৈধভাবে অভিবাসী হতে গিয়ে সাগরে কিংবা গহিন বনজঙ্গলে অকালেই অনেক তাজা প্রাণ ঝরে যায়। তখন পরিবার তো বটেই, যে দেশ ছেড়ে অভিবাসী হওয়ার জন্য বের হলো সে দেশেরও মর্যাদাহানি ঘটে। শুধু মর্যাদাহানিই নয়, এরপর বৈধ পথেও অভিবাসন সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশীদের অবৈধ পথে অভিবাসী হওয়া সমস্যা লাঘবে কঠোর আইন করলেও দেশের মানুষের অবৈধ পথে বিদেশ গমন থামানো যায়নি। নানাভাবে মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। বিভিন্ন স্থানে আটক হয়ে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়ে জীবন পর্যন্ত চলে যাচ্ছে।
ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষা সংস্থা-ফ্রন্টেক্সের সাম্প্রতিক তথ্য দিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই অন্তত ৯ হাজার ৭৩৫ জন বাংলাদেশী এই বিপজ্জনক রুট ধরে ইতালিতে পৌঁছেছেন। গত এক দশকে এই রুট ধরে অন্তত ৭০ হাজার বাংলাদেশী ইউরোপ পৌঁছেছেন। সংস্থাগুলোর তথ্যে আরো জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই রুটে অন্তত ৯২ হাজার ৪২৭ জন বাংলাদেশী ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে যাওয়া ২৩ বাংলাদেশীর লাশ লিবিয়ায় উদ্ধার হয়।
অন্যদিকে, ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্যমতে, এই বিপজ্জনক যাত্রায় অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তির বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ অন্তত ১০ থেকে ১২টি জেলা থেকে ইউরোপে যাওয়ার জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠছে। এই অভিবাসন-প্রত্যাশীদের ৬০ শতাংশ ভালো চাকরির প্রলোভনে পড়ে। বাস্তবে দেখা গেছে, ৮৯ শতাংশ কোনো কাজ পান না; বরং ক্যাম্পে বন্দী হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
শুধু আইন করে অবৈধ অভিবাসন রোধ করা যাবে না। সে আইন যত কঠোরই হোক না কেন। অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন দেশে মানসম্মত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। আমরা খুব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করি, সরকার দেশ থেকে শ্রমিক ভিসায় বিদেশে লোক পাঠাতে যতটা আগ্রহী, দেশের মানুষকে সত্যিকারের শিক্ষিত জনসম্পদে গড়ে তুলতে ততটাই উদাসীন। ফলে স্বল্প শিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর মানুষগুলোই দিন শেষে দালালদের লোভের খপ্পরে পড়ে অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। মানবপাচার চক্রকে শনাক্ত করতে হবে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এ পথে পা বাড়াতে অন্যদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
অবৈধ অভিবাসন রোধে বাংলাদেশ সরকারের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুটের দেশগুলোর সাথে কাজ করা প্রয়োজন। সাগর, সীমান্ত কিংবা যেসব পয়েন্টকে পাচারকারীরা ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে, সেসব স্থানে পাহারা জোরদার করার জন্য দেশগুলোর সাথে সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে ভাবা দরকার।
মানুষের মানসম্মত শিক্ষা, কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান ও সার্বিক জীবনের মানোন্নয়ন করতে পারলে আশা করা যায় অবৈধ অভিবাসন কমবে। এসব বিষয়ে দরকার সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা।