বাংলাদেশকে শেখ হসিনা একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেন। তার সময়ের শেষের দিকে এসে সব প্রতিষ্ঠান কার্যকারিতা হারায়। হাসিনা ও তার মাফিয়া গোষ্ঠীর ইচ্ছা সবকিছুর ওপর স্থান পায়। যদিও রাষ্ট্রকে ধাপে ধাপে অকার্যকর করা হয়েছে সংবিধানের দোহাই দিয়ে। বাহাত্তরের সংবিধানকে পবিত্র বলে গণ্য করা হতো। এর কোনো বিচ্যুতি পতিত শেখ হাসিনার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। বাস্তবে লিখিত ওই সব কথার পবিত্রতা ব্যবহার করা হয়েছে মানুষের অধিকার হরণে।
গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন জন-আকাক্সক্ষার জয় হয়েছে। মানুষ পুরনো নিয়মনীতি বদলে নতুন সংবিধান গঠন করতে চান। জুলাই আন্দোলনকারীদের স্পিরিটের মূল্য দেয়া এখন সময়ের দাবি। তা না হলে দেশে আবার নতুনভাবে ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসতে পারে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জন-আকাঙ্ক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক করে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে, ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ প্রস্তাব করেছে। প্রধান রাজনৈতিক দলসহ প্রায় সব ক’টি দল কিছু মতপার্থক্য থাকার পরও জাতীয় স্বার্থে কমিশনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে না। কয়েকটা বামপন্থী রাজনৈতিক দল ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত মূলনীতির সাথে পুরনো মূলনীতি, ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’ যুক্ত করতে চায়। এ জন্য তারা শক্ত অবস্থান নিয়েছে। সংবিধানের চার মূলনীতি শব্দের মারপ্যাঁচে কোনো পরিবর্তন হলে তার সাথে তারা থাকবে না এবং সে ক্ষেত্রে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা ত্যাগ করারও হুমকি দিয়েছে।
সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদসহ বামপন্থী এসব দল শেখ হাসিনার সংবিধান লঙ্ঘনের সময় চুপ ছিল। সংবিধানের মূলনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ অপপ্রয়োগ করে জাতির ওপর পীড়ন চালানোর সময় ক্ষেত্রবিশেষে সমর্থন জুগিয়েছে। এদের সাথের অন্য কয়েকটি বাম দল হাসিনা সরকারে থেকে তাকে ফ্যাসিস্ট হতে সহযোগিতা করেছে। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া ‘আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ মূলনীতিতে আবার যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে বিএনপি ও জামায়াত। তবে এ ব্যাপারে তারা কমিশনের ওপর জোর খাটায়নি। চব্বিশের অভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীজন জাতীয় নাগরিক কমিটি পুরনো সংবিধানের মূলনীতি সবকিছু বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছে। মোট কথা এ দলগুলো ঐকমত্যের স্বার্থে নমনীয়তা প্রদর্শন করছে। অন্য দিকে ছোট ছোট বাম দল এ নিয়ে চাপাচাপি করে জাতীয় ঐক্য গঠনের পথ বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে।
এ ব্যাপারে তারা জনগণের দোহাই দিচ্ছে এবং বলছে, জনগণের সমর্থন ছাড়া সংবিধানের মূলনীতি বদল করা যাবে না। অথচ জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপ্লব করে শেখ হাসিনাকে পালাতে বাধ্য করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মুখপাত্র সব বড় দল মূলনীতি নিয়ে কমিশনের সাথে একমত। সে ক্ষেত্রে বামদের একরোখা অবস্থান অযৌক্তিক।
সমাজতন্ত্র এখন বিশ্বব্যাপী পরিত্যাজ্য একটি মতবাদ। পৃথিবীর কোথাও এর পক্ষে তেমন জনসমর্থন নেই। বাংলাদেশেও একই অবস্থা। এখানে বাম দলগুলো জনগণের সমর্থন পাচ্ছে না। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার নমে বৃহত্তর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ পীড়ন চালানো হয়েছ। ধর্মপালনকে সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে তকমা দেয়া হয়েছে। সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা এ কর্মে নিপীড়ক সরকারকে সমর্থন করেছে। এ কারণে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতো শব্দগুলো মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করে। বাংলাদেশের জনমানস এ ধরনের শব্দগুলো সংবিধানের মূলনীতিতে আর দেখতে চায় না।